বরিশাল ও খুলনা বিভাগের ২১ জেলায় জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। যার কারণ খুঁজতে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বুয়েটের প্রো ভিসি আবদুল হাসিব চৌধুরীকে আহ্বায়ক করা হয়।

তদন্ত কমিটি গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ নির্ণয়, গ্রিড বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবে। কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে। এছাড়া ভবিষ্যতে গ্রিড বিপর্যয় পরিহারের লক্ষ্যে সুপারিশ দেবে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান, মো. ফিরোজ শাহ, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় (খুলনা), মো. শহীদুল ইসলাম সদস্য (পিঅ্যান্ডডি, অতিরিক্ত দায়িত্ব) বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, মো. আব্দুল মজিদ প্রধান প্রকৌশলী (পরিচালন, ওজোপাডিকো), মো. আতিকুর রহমান (পরিচিতি নম্বর-১-০১২৬৯), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সিস্টেম প্রটেকশন ও টেস্টিং কমিশনিং সেল, (বাবিউবো, ঢাকা), মোহাম্মদ ফয়জুল কবির (প্রধান প্রকৌশলী, অ. দা., ট্রান্সমিশন-১, পিজিবি পিএলসি) এবং মো. মাজহারুল ইসলাম, সদস্য-সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, (নবায়নযোগ্য জ্বালানি-১ শাখা) বিদ্যুৎ বিভাগ।

এদিকে লোডশেডিং করার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, লোডশেডিং হচ্ছে এবং হবে। তিনি বলেন, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হবে। শহর এবং গ্রামে সমানভাবে লোডশেডিং করা হবে। রোববার সচিবালয়ে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিপর্যয় নিয়ে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান।

লোডশেডিং নিয়ে অনেকে ভুল তথ্য দেয় জানিয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, আমি অস্বীকার করছি না লোডশেডিং করা হচ্ছে। লোডশেডিং হচ্ছে এবং হবে। এনএলডিসি (ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার) ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো থেকে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তারা কতটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছে আর তাদের চাহিদা কত, একটা হিসাব করলেই লোডশেডিং হচ্ছে কি না পাওয়া যাবে। আমি অনেক জায়গায় গিয়ে দেখেছি যে লোডশেডিং নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে আপনার বাড়িতে বিদ্যুৎ না-ও থাকতে পারে। ট্রান্সমিটার নষ্ট থাকতে পারে। গত সরকারের আমলে নি¤œমানের পণ্য কিনেছে, এজন্য এগুলো বেশি হচ্ছে। ‘আমি অস্বীকার করছি না লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিং হচ্ছে এবং হবে।’

শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপদেষ্টা বলেন, শহর এবং গ্রামে আলাদা করে লোডশেডিং করা হবে না। আমরা পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছি, লোডশেডিং সমানভাবে করতে হবে।

ফাওজুল কবির খান বলেন, আমরা এখন সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। চাহিদা তো আরও বাড়বে। মূলত তাপমাত্রার ওপর এটি নির্ভর করছে। তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত যেতে পারে। আমরা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন পুরোদমে চালাচ্ছি না, যখন চাহিদা বাড়বে তখন সেগুলো আরও চালানো হবে’- বলেন উপদেষ্টা।

বিদ্যুৎ উপদেষ্টা আরও বলেন, লোডশেডিং আমরা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করবো। শহর এবং গ্রাম এলাকায় লোডশেডিং সমানভাবে বণ্টনের চেষ্টা করবো। বিষয়টি আমি আজ থেকে ব্যক্তিগতভাবে মনিটর করবো। শহর এবং গ্রামাঞ্চলে কী পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে, সে তথ্য তাকে জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন উপদেষ্টা।

খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ যেটা দেখেছে সেটা হলো, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ ডাবল লাইনে একটা ফল্ট হয়েছে। দুটি তার একত্র হয়ে যাওয়ার ফলে কিন্তু এই জিনিসটা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ জেনারেশন ইউনিটগুলো বন্ধ হয়ে যায়।এ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দুই হাজার ২৭৭ মেগাওয়াটের সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায় বলেও জানান বিদ্যুৎ উপদেষ্টা। এরই মধ্যে সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে এখন আর কোনো সমস্যা নেই বলেও জানিয়েছেন ফাওজুল কবির খান।

তিনি বলেন, এর আগে বিপর্যয়ের সময় গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়ে আমরা জানতে চাইবো। সেগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে কি না বা না হলে কেন হয়নি এ বিষয়গুলোও কমিটি দেখবে।

বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার জন্য সরকার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যার জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছে। এখন আমরা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থ সহায়তায় দুটি স্থানে এটা করছি। একটি ঈশ্বরদীতে ৩০ মেগাওয়াট আরেকটি ভুলতায় ৯০ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের স্ট্যাবিলিটি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ বিচ্যুতির কারণ জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রাণালয়। রোববার মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিবৃতি পাঠানো।

এতে বলা হয়, শনিবার গ্রিড নেটওয়ার্কে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। এদিন বিকাল ৫টায় মোট জেনারেশন ছিল ১৪৫২০ মেগাওয়াট এবং সিস্টেম ফ্রিকুয়েন্সি ছিল ৫০.৪ হার্জ। এ অবস্থায় ৫টা ৪৫ মিনিটে ৪০০ কেভি আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ ডাবল সার্কিট লাইনে ফল্ট সংঘটিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের যশোর, বেনাপোল ও নোয়াপাড়া উপকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ১০টি জেলায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্যুতি ঘটে।

তবে, ২৩০ কেভি ঈশ্বরদী-ভেড়ামারা-ঝিনাইদহ লিঙ্কটি চালু থাকায় ২৩০ কেভি এবং ১৩২ কেভি লেভেলে সংযুক্ত ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা উপকেন্দ্রগুলো চালু ছিল। এই ২৩০ কেভি লিঙ্ক ব্যবহার করে পাওয়ার গ্রিডের এনএলডিসি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় দক্ষতার সাথে যশোর, বেনাপোল, নোয়াপাড়া উপকেন্দ্রগুলো চালু করা হয়। ফলে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

অন্যদিকে, ৪০০ কেভি আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ ডাবল সার্কিট লাইনের সংঘটিত ফল্টে ১৩২০ মেগাওয়াট বিসিপিসিএল (পায়রা), ১৩২০ মেগাওয়াট আরএনপিএল, ৩০৭ মেগাওয়াট বরিশাল ইলেকট্রিক, ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল, ২২৫ মেগাওয়াট ভোলা নতুন বিদ্যুৎ ও ২২৫ মেগাওয়াট ভোলা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ৫০০ মেগাওয়াট এইচভিডিসি ব্লক-২ ট্রিপ করে প্রায় ২২৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিচ্যুতি ঘটে। বিকেল ৬টা ১৯ মিনিটে ৪০০ কেভি আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ সার্কিট-১ এবং বিকেল ৬টা ২৫ মিনিটে সার্কিট-২ চালু করা হলে ৪০০ কেভি আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ-আমতলী লিঙ্কটি সচল হয়।

এ অবস্থায় সিনক্রোনাইজিং বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ফলে সন্ধ্যা ৭টা ১ মিনিটে ১৩২০ মেগাওয়াট বিসিপিসিএল (পায়রা) বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ এবং সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে ইউনিট-২ সিনক্রোনাইজ করা হয় এবং ৭টা ৩০ মিনিট নাগাদ ওই অঞ্চলগুলোর বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রও গ্রিড নেটওয়ার্কে সিনক্রোনাইজ করা হলে রাত ৯টায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক হয়।

প্রাথমিকভাবে ৪০০/২৩০/১৩২ কেভি আমিনবাজার এবং ৪০০/২৩০/১৩২ কেভি গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্র থেকে ৪০০ কেভি আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ ডাবল সার্কিট লাইনের প্রটেকটিভ রিলের ফল্ট রেকর্ডসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সংগৃহীত তথ্য প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, আমিনবাজার উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ৬৫ কি.মি. দূরে এবং গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ কি.মি. দূরে সার্কিট-১ এর ব্লু-ফেজ এবং সার্কিট-২ এর রেড-ফেজ এর মাঝে ট্র্যানজিয়েন্ট শর্ট-সার্কিট সংঘটিত হওয়ার কারণে সার্কিট দুটির উভয় প্রান্ত থেকে সিস্টেম প্রোটেকশনের জন্য ব্যবহৃত প্রটেকটিভ রিলের স্বয়ংক্রিয় অপারেশনে তদসংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ট্রিপ করে যায়।

উপরোক্ত তথ্যের বিস্তারিত কারিগরি যৌক্তিকতা অনুসন্ধান করতে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পাওয়ার গ্রিড থেকে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বর্ণিত ট্রিপিং এর বিস্তারিত কারণসহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানা যাবে, বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।

স্কল দিতে হবে টেলিভিশনে

বিদ্যুৎ, মেট্রোরেল, সড়ক ও রেলপথের গ্রাহক বা যাত্রীসেবায় কোনও ধরনের বিঘœ ঘটলে তা তাৎক্ষণিক টেলিভিশনের স্ক্রলের মাধ্যমে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এ সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক নির্দেশনা জারি করেছেন।

নির্দেশনায় বলা হয়, শনিবার মেট্রোরেল চলাচলে সাময়িক বিঘœ ঘটে এবং খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার প্রধানেরা উপদেষ্টাকে কোনও তথ্য দেননি। বরং উপদেষ্টা বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এখন থেকে যেকোনও গ্রাহক বা যাত্রীসেবা বিঘেœর ঘটনা দ্রুত টিভি স্ক্রলে প্রচার করতে হবে। একইভাবে, সেবা পুনরায় চালু হলে সেটাও জানাতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, মনে রাখতে হবে, গ্রাহক ও যাত্রীসেবা আমাদের দয়া নয় বরং দায়িত্ব।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেল চলাচল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে সময় মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং জনগণকে অবহিত না করায় উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছেন। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যায়, সে জন্য এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।