কোনোভাবেই হামের লাগাম টানা যাচ্ছে না। থামানো যাচ্ছে না মৃত্যু। প্রতিদিন চারদিক থেকে আসছে মৃত্যুর খবর। প্রতিদিন খালি হচ্ছে মায়ের। কলিজা ধন কোলের মধ্যে হারিয়ে মা-বাবাসহ আত্মীয় স্বজনদের আত্মচিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতালের সামনের পরিবেশ। নিরাময়যোগ্য এই হামের কেন থামানো যাচ্ছে তার যথাযথ উত্তর মিলছে না রাষ্ট্রের কর্তাদের কাছ থেকে। বিষয়টি নিয়ে একেক জন একেকরকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় গত এপ্রিলে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশ ও বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে ক্যাম্পেইন চালানো হয় এবং পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২০ মে এটি শেষ হয়। এই সময়ে এক কোটি ৮৩ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা নেওয়ার পর বা প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণের পর শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সেই হিসেবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরি ধীরগতিতে হচ্ছে বা যথাযথভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে তীব্র অপুষ্টি, ডায়রিয়া, প্রোটিনের ঘাটতি এবং দুর্বল পুষ্টি পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এক মাসের বেশি সময় ধরে টিকাদান কার্যক্রম চললেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আশানুরূপভাবে কমছে না। তাদের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার। পর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রোটিন ও ব্রেস্টফিডিংয়ের অভাবে অনেক শিশুর শরীরে টিকা কার্যকরভাবে কাজ করছে না বা প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। ফলে টিকার পাশাপাশি পুষ্টি নিশ্চিত করাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। তবে, উন্নত বিশ্বে সাধারণত প্রথম ডোজ ১৫ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ প্রি-স্কুলগামী চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের দেওয়া হয়। কারণ, সেখানে শিশুদের অপুষ্টির হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি স্থিতিশীল থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “হামের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা শিশুর বয়স এবং পুষ্টির অবস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। বয়স যত কম হয়, টিকার কার্যকারিতা তত কম হয়। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পায়। অপুষ্টি না থাকলে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করে।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট টেনে এই চিকিৎসক বলেন, “মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত নয় মাস পর্যন্ত শিশুকে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। এই কারণেই নয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হয়। কারণ এর পর থেকে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সুরক্ষা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। তবে, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু নয় মাস বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৯৫০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং ১৮৭ জনের দেহে নিশ্চিতভাবে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত হাম উপসর্গে মোট ৭১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৮১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে তিনজন। এছাড়া চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৮৫৪ জন নতুন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৬৮ জন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট এক লাখ ২২ হাজার ১৫০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মোট ১৫ হাজার, ১৯৪ জনের শরীরে নিশ্চিত হামের সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
জেলা ও বিভাগ বিবেচনায় সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এ পর্যন্ত মোট এক লাখ চার হাজার ৭১৭ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক লাখ এক হাজার ৫৬ জন।