গভীর শোক প্রধান উপদেষ্টার আসামীদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ

চিকিৎসকদের কোনো চেষ্টাই কাজে এল না; বাঁচানো গেল না মাগুরায় ধর্ষণের শিকার আট বছরের শিশু আছিয়াকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১টায় তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে জানান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক কর্নেল নাজমুল হামিদ। এদিকে, তার মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর- আইএসপিআর। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আসামীদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আর আগামী সাত দিনের মধ্যে শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

গতকাল সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে শিশুটির নিথর দেহ যখন তার অল্প ক‘দিনের চেনা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। ডুকরে কেঁদে ওঠে উপস্থিত সবাই। সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রথম জানাযা গ্রামের বাড়িতে ও দ্বিতীয় জানাযা শেষে তাকে বাড়ির কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। হয়েছে বিচারের দাবীতে মশাল মিছিলও। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এই নৃশংস ঘটনার বিচার দাবী করা হয়েছে।

মাগুরা শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ৬ মার্চ শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। সেই খবরে সারা দেশে তৈরি হয় ক্ষোভ। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মিছিল, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি চলছে।

শিশুটির মা গত ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। মামলার আসামীরা হলেন শিশুটির ভগ্নিপতি সজীব হোসেন (১৮) ও বোনের শ্বশুর হিটু মিয়া (৪২), সজীবের অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাই (১৭) এবং তাদের মা জাবেদা বেগম (৪০)। তাদের চারজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলার নথিতে বলা হয়, সজীবের সহায়তায় তার বাবা হিটু মিয়া শিশুটিকে ‘ধর্ষণ’ করেন। বিষয়টি জাবেদা ও তার ছোট ছেলেও জানতেন। ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটিকে হত্যার চেষ্টা চালান তারা।

নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে নেওয়া হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ৬ মার্চই তাকে ঢাকা মেডিকেলের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরে শুক্রবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা শনিবার জানিয়েছিলেন, শিশুটির অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’। এরপর তার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলেও সন্ধ্যায় তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল-সিএমএইচে নেওয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, “আজ সে আরও দু’বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়বার প্রায় ৩০ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পর হৃদস্পন্দন ফিরেছে, তবে তার মস্তিষ্ক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। “কোমা স্কেলে (জিসিএস) মাত্রা ৩, যা গভীর অচেতন অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। শিশুটির রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রাও বিপজ্জনকভাবে কম।’’ এরপর দুপুরে শিশুটির মৃত্যুর খবর দেয় আইএসপি আর। সেখানে সেনাবাহিনীর তরফে শোক প্রকাশ করা হয়।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, “সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির আজ সকালে তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে, দুইবার স্থিতিশীল করা গেলেও তৃতীয়বার আর হৃদস্পন্দন ফিরে আসেনি।”

শোকের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া মাগুরায়

শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মাগুরার বিশিষ্টজনেরা। সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন আসামীদের প্রকাশ্যে সর্ব্বোচ্চ শাস্তির। শিশুটির মৃত্যুর সংবাদে জেলায় শোকাতুর-স্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। এখনো শহরে কোনো বিক্ষোভ দেখা যায়নি।

তবে মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহেদ হাসান টগর ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মাগুরায় এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। কোনোভাবেই এ ধর্ষণ-মৃত্যুর বিষয়টি মেনে নিতে পারছি না।” তিনি বলেন, “আমরা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ধর্ষকদের পক্ষে কোনো আইনি সহায়তা দেওয়া হবে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য আইনজীবী সমিতি সব ধরনের সহায়তা করবে।”

জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লাবণী জামান বলেন, “সারাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে চলেছে। যে কারণে মাগুরায় এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। “আমরা মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে শিশুটির ধর্ষকের অবিলম্বে ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জেলা মহিলা পরিষদ সবসময় শিশুটির পরিবারের পাশে থাকবে।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. হুসাইন বলেন, ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় তারা চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তিনি অবিলম্বে শিশু ধর্ষণ-মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবি করে তিনি বলেন, “এ ঘটনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষকদের ফাঁসি কার্যকর করা না হলে ছাত্র-যুব সমাজ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মাগুরায় দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে।”

শিশুটির ধর্ষণ-মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে জেলা গণকমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, “শিশুটির মৃত্যুতে আমরা শোকাহত, একইসঙ্গে আমরা অবিলম্বে ধর্ষকের বিচার দাবিতে আন্দোলনে মাঠে থাকব।” এ বিষয়ে মাগুরা শহরের রিকশা চালক আব্দুর রহমান ‘ধর্ষকের প্রকাশ্যে ফাঁসি’ দাবি করে।

শিশুটির মৃত্যুতে তার গ্রামেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওই গ্রামের বাসিন্দা ও শিশুটির প্রতিবেশী ওহিদুর রহমান বলেন, মর্মান্তিক এ ঘটনায় তারা বাকরুদ্ধ। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করে ধর্ষকের ফাঁসির দাবি জানান।

মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন শিশুটির প্রতিবন্ধী বাবা, তিনি বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এর মধ্যেই তিনি ‘ধর্ষকের গোটা পরিবারসহ’ সবার ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।

সদর থানার ওসি আয়ুব আলী জানান, ধর্ষণের শিকার শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এদিকে তারা আসামীদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সতর্ক রয়েছেন বলে জানান ওসি।

প্রধান উপদেষ্টার শোক

সেই শিশুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এ মামলার আসামীদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে, মাগুরায় নির্যাতিত শিশুটি আজ বেলা ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। সিএমএইচের সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির আজ সকালে তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। দুইবার স্থিতিশীল করা গেলেও তৃতীয়বার আর হৃৎস্পন্দন ফিরে আসেনি।

আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ৮ মার্চ শিশুটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। শিশুটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিশুটির শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে মাগুরার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান তার বোনের শাশুড়ি। পরে শিশুটির মা হাসপাতালে যান। সেদিন দুপুরেই উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে রাতেই পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর শুক্রবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সংকটাপন্ন অবস্থায় শিশুটিকে শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) থেকে সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়। তাকে ঢাকার সিএমএইচের পিআইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে মাগুরায় লাশ জানাযা সম্পন্ন

শিশুটির লাশ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে মাগুরায় পৌঁছেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে লাশ বহন করা হেলিকপ্টারটি মাগুরা স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা জেলা প্রশাসক অহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা। সন্ধ্যা সাতটায় শহরের নোমানী ময়দানে শিশুটির জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। পরে লাশটি সেনাবাহিনী ও পুলিশের তত্ত্বাবধানে শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

শিশুটির লাশের সঙ্গে হেলিকপ্টারে শিশুটির মা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার মাগুরায় যান। পরে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা রাষ্ট্র বা সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখছে। কারণ এত ছোট্ট বাচ্চা একটা মেয়ের ধর্ষিত হওয়া মেনে নেওয়া যায় না, এটা কারও জন্য মেনে নেওয়া যায় না। শিশুটি (নাম) আমাদেরই মেয়ে। কাজেই আমরা সেভাবেই দেখছি।’

সন্ধ্যায় প্রায় একই সময়ে আলাদা একটি হেলিকপ্টারে মাগুরায় আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম ও খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। সন্ধ্যা সাতটার দিকে শহরের নোমানী ময়দানে শিশুটির জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর লাশ শিশুটির গ্রামে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে বলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৯০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের বিচার কাজ শেষ করতে হবে। ধর্ষণের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে এ কারণে যেন আর কেউ এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে সাহস না পায়।”

এর আগে দুপুরে শিশুটির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এলাকাবাসী ও আত্মীয়স্বজন শিশুটির বাড়িতে গিয়ে ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। দুপুরে জেলার শ্রীপুর উপজেলায় শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা ও ছোট বোন বাড়িতে আছে। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীরা ভিড় করছেন। ঘটনার পর শিশুটির বাবা মানসিকভাবে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেয়ের মৃত্যুর খবরে তিনি চুপচাপ হাঁটাহাঁটি করছেন, কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না।

শিশুটির চাচা (বাবার ফুফাতো ভাই) বলেন, ‘আজ দুপুরে আমরা মৃত্যুর খবর পাই। এলাকার গোরস্থানে দাফনের জন্য কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। আমরা এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

‘আমার মেয়ের মতো কষ্টে তারেও দেখতে চাই’

মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ মা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলাপ করছেন। এসময় তিনি বলেন, ‘আমার মণি যেভাবে মরছে, আমি তারও (অপরাধীর) ফাঁস দিয়ে বিচার চাই। (তার) এরম মৃত্যু চাই আমি, আমার মণির যেমন বেলেড দিয়ে কাটছে, গলায় ফাঁস দেসে, ঠিক সেরকম বিচার চাই আমি আপনাদের কাছে। ওরে যেন ওইরকম ফাঁসি দিয়ে মারে। ওরকম যেন ওরে বেলেড দিয়ে কাটে। আমার মেয়েটারে যে কষ্ট দিছে না, আমি তারেও এরকম দেখতে চাই।’ সেদিনের ঘটনার প্রসঙ্গে শিশুটির মা বলেন, ‘ওর আপার বাড়িতে যাওয়ার পর, ওর আপাকে ধরে মেরেছিল। তখন আছিয়া বলেছিল, সে বাড়িতে গিয়ে সব বলে দেবে। এরপরই সেই রাতে এরকম ঘটনা ঘটেছে। বড় মাইয়াটারে ইচ্ছামতো মেরে আলাদা ঘরে থুইয়া দিছিল। পরে রাত ১১টার দিকে আমার কাছে ফোন দিয়ে বলসে আমার মণি অসুস্থ। আমি গিয়ে দেখি সদর হাসপাতালে ভর্তি করাইছে। তারে রাইখে পলাইছে ওই মহিলা।’

আমাদের মাগুরা সংবাদদাতা জানান,

মাগুরার ধর্ষিত শিশুর লাশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে মাগুরা নোমান ময়দানে পৌছালে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়ে। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয়ে নামাজে জানাজা। জানাজায় মাগুরার জেলা প্রশাসক মোঃ অহিদুল হোক, খেলাফত আন্দোলনের মামুনুল হক, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লা, মাগুরা জেলা বিএনপির সদস্য্য সচিব মনোয়ার হসেন খান, যুগ্ম আহবায়ক আহসান হাবীব কিশোর, জেলা জামায়াতের আমীর এমবি বাকেরসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ জানাযায় অংশগ্রহণ করে।

সন্ধা সাড়ে সাতটায় শিশু আছিয়ার লাশ নিয়ে যাওয়া হয়ে গ্রামের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে। তার নিজ গ্রাম জারিয়ায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে সোনাইকুন্ডি কবরস্থানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের তত্বাবধানে দাফন করা হয়। সন্ধ্যায় সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তার লাশ নিয়ে এসে মাগুরায় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সেই শিশুটির ‘ধর্ষকের’ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মহাসড়কে বিক্ষোভ

শিশুটি মাগুরা সদর উপজেলার যে বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেই বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার নিজনান্দুয়ালী গ্রামের হিটু মিয়ার বাড়িতে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা ওই বাড়িতে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানান ঘটনাস্থলে থাকা ওই গ্রামেরই বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম।

এদিকে ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত বিচারের দাবিতে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ বিক্ষোভ করছে স্থানীয় জনতা। রাত ৮টার দিকে তারা মাগুরা শহরের ভায়না মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে সড়কের উভয় পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়।

মাগুরা শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ৬ মার্চ শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। সেই খবরে সারা দেশে তৈরি হয় ক্ষোভ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয় বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর- আইএসপিআর জানিয়েছে। পরে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে শিশুর লাশ মাগুরা নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মাগুরা শহরের নোমানী ময়দান শিশুটির প্রথম জানাজা এবং পরে শ্রীপুর উপজেলা জারিয়া গ্রামে দ্বিতীয় দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।