ঢাকাস্থ বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধিগণ ও বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিরা জামায়াতের ছায়া বাজেটকে গণতান্ত্রিক চর্চার অনন্য নজির হিসেবে দেখছেন। ওইসব দূতাবাসের ও বিদেশী সংস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শাখার কর্মকর্তারা জামায়াতের এই উদ্যোগকে গঠনমূলক এবং পেশাদারী, গণতান্ত্রিক চর্চার অনন্য নজির, পজিটিভ এনগেজমেন্ট এবং রাজনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় হিসেবে মন্তব্য করেন। জামায়াতে ইসলামী ছায়া বাজেট সম্পর্কে ইতিমধ্যে দেশের গণমাধ্যমে ও রাজনৈতিক আলোচনায় প্রশংসা করা হচ্ছে। তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো বন্ধুভাবাপন্ন মুসলিম দেশগুলো জামায়াতের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক ও সুশৃঙ্খল হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এইসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটের একটি করে ইংরেজি কপি ঢাকাস্থ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাস (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক, সৌদি আরব) এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের সময় এবং পরবর্তীতে তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভালো দিক হিসেবে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। এদিকে গত মঙ্গলবার ৯ জুন রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা ছায়া বাজেট প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসন, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, জনপ্রশাসন খাতে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে। এ খাতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এছাড়াও গত বুধবার বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছায়া সরকার ও ছায়া বাজেট উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উভয়পক্ষ বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত ও গতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মতবিনিময়কালে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় বাজেট, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা, অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, তারা মূলত দুটি কারণে জামায়াতের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। ১. দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর একটি বড় অংশের ধারণা ছিল জামায়াত কেবল একটি ধর্মভিত্তিক ও মাঠের আন্দোলনের রাজনৈতিক দল। কিন্তু জামায়াত যখন ডাটা, পরিসংখ্যান এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক (যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার, অর্থ পাচার রোধ) নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছায়া বাজেট পেশ করল, তখন কূটনৈতিক মহল বুঝতে পারল যে দলটি দেশ পরিচালনার জন্য একটি মেধাভিত্তিক উইং বা থিংক-ট্যাংক গড়ে তুলেছে। এই মেধাভিত্তিক চর্চাটিকে তারা ইতিবাচক মনে করেন। ২. একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে সরকারের ভুলত্রুটি ধরার পাশাপাশি নিজেরা কী বিকল্প দিতে চায়; এই সংস্কৃতিকে পশ্চিমা কূটনীতিবিদরা সবসময় স্বাগত জানান। এটি একটি রাজনৈতিক সক্ষমতার পরিচয়।
সূত্র জানায়, জামায়াতের নেতৃবৃন্দ যখন ছায়া বাজেটের কপি মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করেন; তখন তারা বাজেটের কপি গ্রহণের সময় জামায়াতের এই ছায়া বাজেট উপস্থাপনকে একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও ইতিবাচক মন্তব্য করেন। তারা জামায়াতের ছায়া বাজেটে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার প্রশংসা করেছেন। কূটনীতিবিদরা কর কাঠামোর সংস্কার এবং বৈদেশীক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য জামায়াতের দেওয়া ছায়া বাজেটকে বেশ গোছানো ও আধুনিক বলে মন্তব্য করেছেন।
ঢাকার পেশাদার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই বাজেটটি প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না, বরং এতে দেশের অর্থনীতির আসল ক্ষতগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল। অর্থ পাচার রোধ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব খাতের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধের যে সাহসী প্রস্তাব জামায়াত দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুশাসনের ধারণার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এছাড়াও দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো যায়, সেই ফর্মুলাটি কূটনীতিবিদদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই ছায়া বাজেটের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেবল মাঠের আন্দোলনের রাজনৈতিক দল নয়, বরং দেশ ও জনগণের যেকোনো সংকটে বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে আমরা সবসময় প্রস্তুত। আমাদের এই ছায়া বাজেট কোনো চটকদার বা কাল্পনিক রাজনৈতিক ইশতেহার নয়। এটি অত্যন্ত নিবিড় গবেষণা, বস্তুনিষ্ঠ ডাটা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের আকাক্সক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা একটি বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং অর্থ পাচারের কারণে সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্তরা যে তীব্র অর্থনৈতিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা থেকে মুক্তির স্পষ্ট পথ এই বাজেটে দেখানো হয়েছে। আমরা প্রথাগত করের বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো যায় এবং দেশের টাকা দেশে রেখে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়, সেই ফর্মুলা দিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার; একটি শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং সুশাসিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিটি পয়সার হিসাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশের বিশেষজ্ঞ মহলে এই বাজেটের যে ইতিবাচক মূল্যায়ন হচ্ছে, তা আমাদের এই মেধাভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাজনীতিরই স্বীকৃতি।