গাজীপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত স্কুলছাত্র আবুল কাশেমের (১৮) বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস। বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই রাস্তায় নেমে আসে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহরজুড়ে বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল বের করে তারা, হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর।বৃহষ্পতিবার জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেইসবুকে কাশেমের মৃত্যুর খবরটি পোস্ট করে লিখেছেন, গাজীপুরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত কাশেম শহীদ হয়ে গেছেন। প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ আমার এই ভাই। ওই পোস্টে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে লিখেছেন, “ইন্টেরিম, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করো, করতে হবে।
কাশেমের করুণ জীবন সংগ্রামঃ
শৈশবেই মায়ের স্নেহ হারানো কাশেমের জীবনের গল্প রূপকথার নয়, এক করুণ বাস্তবতা। দেড় বছর বয়সেই মা রেখা বেগম তাকে রেখে চলে যান, আর ফিরে তাকাননি। বাবা হাজী জামাল উদ্দিন চিশতির দ্বিতীয় সংসারেও আশ্রয় মেলেনি কাশেমের। দাদির কাছেই ছিল তার শৈশব, কিন্তু তিনিও চলে গেলে একা হয়ে পড়ে কাশেম। তার বড় ভাই হাতেম ৬মাস আগে মারা যায়। সুইটি নামের ছোট একটি বোন রয়েছে তার।
নিজের বাবার রেখে যাওয়া দেড় কাঠার একটি ছোট্ট বাড়ির ভাড়া দিয়েই চলতো তার সংসার। তিনটি কক্ষের একটি সে নিজে থাকতো, রান্না করতো নিজ হাতে। রানা করতে না পারলে সেদিন না খেয়ে থাকতে হতো তাকে।পড়াশোনার পাশাপাশি শ্রমিকের কাজ করতো, আর বুকে লালন করতো সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।
সংগ্রামী ছাত্র থেকে হত্যার শিকারঃ
স্থানীয়রা বলছেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কাশেম ছিল বোর্ডবাজার এলাকার ছাত্রদের প্রথম সারির কর্মী। যেখানে অন্যায়, সেখানেই তার প্রতিবাদ।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার), জুলাই-আগস্ট গণহত্যায় অভিযুক্ত সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে বিক্ষোভে যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। এ সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত কাশেমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, বুধবার বিকেল ৩টায় আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।
শহরজুড়ে উত্তাল প্রতিবাদ, দোষীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনঃ
কাশেমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গাজীপুরজুড়ে ফুঁসে ওঠে ছাত্রসমাজ। বিক্ষোভ মিছিল বের হয় বিবাড়ি মোড় থেকে, যা শিববাড়ি মোড়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হয়ে রাজবাড়ি সড়কে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।
কাশেমের একমাত্র বোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন ইসলামী ছাত্র শিবিরঃ
গাজীপুরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় শহীদ আবুল কাশেমের পরিবারের সাথে বুধবার রাতেই সাক্ষাৎ করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও গাজীপুর মহানগরে সভাপতি রেজাউল ইসলাম। সাথে ছিলেন গাজীপুর মহানগরের ইসলামী ছাত্র শিবির ও জামায়াতের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এসময় শহীদ আবুল কাশেমের একমাত্র বোন সুইটিকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয় এবং তার পড়াশোনার সকল দায়িত্ব ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বহন করা ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুর সদর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। এতে ১৭ জন গুরুতর আহত হন।
বড় পরিসরে মামলা, গ্রেফতার ১৩২ জনঃ
এ ঘটনায় রোববার দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুর জেলা আহ্বায়ক মো. আব্দুল্লাহ মোহিত একটি মামলা দায়ের করেন। ২৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ২০০-৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কাশেমের জানাজা বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় গাজীপুর রাজবাড়ি ময়দানে, এরপর বোর্ডবাজার সংলগ্ন আল হেরা সিএনজি পাম্পের মাঠে আরেক দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
নিরপরাধ ছাত্র কাশেমের এভাবে চলে যাওয়া কি আমাদের ব্যথিত করে না? তার রক্তের দাগ কি উত্তর দেবে না? উত্তাল গাজীপুর আজও অপেক্ষায়, বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছাত্রসমাজ!