ছোট বেলা থেকে হামার ব্যাটা শান্ত প্রকৃতির ছিল। হামার ব্যাটা কি দোষ করছিল যে তাকে ওরা এভাবে হত্যা করলো। আমার বুক খালি করলো কেন? তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দেও বাবা। হামি ক্যামনে একা এই বাড়িতে থাকমো। এভাবে কোন মানুষ মানুষকে মারে। হত্যাকারীদের তোমরা ফাঁসি দাও হামি যেন ওদের ফাঁসি ও বিচার দেখতে পারি। গত সোমবার বিকেলে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নিহত ছাত্র শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারীর মা শাহারা বানু। তাঁর মৃত্যুর খবরে বাড়িতে এলাকাবাসী আত্মীয়স্বজনেরা একনজর দেখার জন্য ভিড় করছিল। সবাই সাইফুল্লাহ স্মৃতি হাতড়ে কান্নাকাটি করছিলেন। গতকাল দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের শিমুলতাইড় গ্রামে সাইফুল্লাহ বারীর বাড়িতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।
শিবির নেতা সাইফুল্লাহ, ওই গ্রামের মোয়াজ্জিন হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন। গত ২১ জুন রবিবার বিকেলে উপজেলার বোনারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত হন তিনি। সাইফুল্লাহ বারী মায়ের আহাজারির সময় পাশেই ছিলেন তাঁর দুই বড় বোন হাজেরা আকতার ও শরিফা বেগম। নিহত সাইফুল্লাহ বারীর বাবা হাবিবুর রহমান তিনি বাকরুদ্ধ অবস্থায় বললেন আমার ছেলে কি অপরাধ ছিল যে তাকে অকালে জীবন দিতে হলো। তিনি এজন্য সমাজ রাষ্ট্রকে বলেন এভাবে আর কত বাবামায়ের বুক খালি হবে? আমার ছেলে তো কোন অপরাধ করেনি। সে তো ছাত্র। পড়াশুনা করা অবস্থায় ছিল। হাবিবুর রহমান একটি স্থানীয় মসজিদে মোয়াজ্জিন হিসেবে চাকরি করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সেদিন জোহরের নামায পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি সাইফুল্লাহ বাজারের চারমাথায়। পরে সেখানে এগিয়ে যাই। জানতে পারি এক শিক্ষককে যুবদলের মুকুল ও তার ভাইরা অবরুদ্ধ করে রাখছে। আমার ছেলে তার প্রতিবাদ করছে মাত্র। এক পর্যায়ে ছেলে আমাকে বলে, আব্বা তুমি এখান থেকে চলে যাও এখানে যে বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ সেটি সমাধান হয়েছে। কোনো ঝামেলা হবে না। আমি মসজিদে চলে আসি। তার একটু পরই আমার বড় ছেলে ফারুক দৌড়ে এসে বলে,আব্বা সাইফুল্লাহকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। দ্রুত তাকে হাসপাতাল নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি এবং সে সাইফুল্লাহকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটতে থাকি। এতে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ছেলে আমার মারা যায়।
তিনি বলেন-হত্যাকারীদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে আমার মতো আর কেউ সন্তান হারানোর যন্ত্রনা সইতে না পারে। এ সময় উঠানে আহাজারি করছিলেন সাইফুল্লার বড় ভাই ফারুক আহমেদ। পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাঘাটার উপজেলার কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা চত্বরে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লার সাথে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়কের মুকুলের কথার কাটাকাটি হয়। পরে স্থানীয় নেতাদের সমঝোতায় বিষয়টি মীমাংসা হয়। এরপর উপজেলা চত্বর থেকে সবাই চলে যায়।
এ ঘটনার কয়েক মিনিট পর উপজেলার বোনারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে ওই শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখে মুকুল ও তার লোকজন। পরে নিহত ছাত্র শিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ ও শিবির কর্মী সালাউদ্দিন ওই শিক্ষককে ছেড়ে দিতে বলেন। এসময় সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুল মিয়া ও তার ছোট ভাই পলাশ, বোনারপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য রবিউল ইসলাম, যুবদল নেতা আশরাফ, যুবদল নেতা মোনারুল ও জব্বারসহ ১০/১৩ জন ধারালো অস্ত্র নিয়ে শিবির কর্মী সালাউদ্দিনের ওপর হামলা করে। এসময় হামলাকারিরা সালাউদ্দিনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে। এসময় বোনারপাড়া ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি এগিয়ে আসলে তাকে ধাওয়া করে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনের রাস্তার উপর ফেলে গলায় আঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত দুজনকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে শিবির নেতা সাইফুল্লাহকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলায় যুবদল নেতা মুকুলসহ ২৫জনকে আসামী করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেফতারের জন্য জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।