আব্দুর রাজ্জাক রানা, খুলনা : সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ি-সংলগ্ন বনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এখনও বনের মধ্যে ধোঁয়া উড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর আগে শনিবার সকাল ৯টার দিকে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ি-সংলগ্ন বনে ট্যাপার বিল ধোঁয়া দেখতে পায় পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে বন বিভাগ আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। বিকেলের দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট। ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও স্থানীয়রা সুন্দরবনে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে বনের মধ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা ধরে ফায়ার লাইন (শুকনো পাতা, মাটি সরিয়ে নালা) করা হয়েছে। তবে কাছাকাছি পানির উৎস না থাকায় ওই এলাকায় পানি দেওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৪ সালের ৪ মে চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া বনের লতিফের ছিলা এলাকায় আগুন লেগে ৭.৯৮ একর বনভূমির গাছপালা পুড়ে যায়। এতে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫০ টাকার ক্ষতি হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের শরণখোলা স্টেশনের কর্মকর্তা আফতাদ-ই-আলম বলেন, দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ফায়ার লাইন কাটা হয়েছে। আগুন আশা করা যায় আর ছাড়াবে না। কোথাও ধোঁয়া আছে, কোথাও এখনও একটু একটু করে জ্বলছে। আলো না থাকায় রাতে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আর্ধেকটা পথ পর্যন্ত পাইপ টেনে নেওয়া গেছে। তবে পানি দেওয়া যায়নি। পাইপ টেনে সকাল থেকে পানি দেওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বনাঞ্চলে ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখার পর বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। বন বিভাগের সাথে স্বেচ্ছাসেবকসহ শত শত স্থানীয় বাসিন্দা আগুন নিয়ন্ত্রণে বনের মাঝে ফায়ার লাইন কাটার কাজ করেছে। তবে কাছাকাছি কোন নদী-খাল না থাকায় সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানি দেওয়ার কাজ শুরু করা যায়নি। রাত সাড়ে ৭টার দিকেও বনের মধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে আগুন ও ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখা গেছে।
ঘটনাস্থল থেকে ঘুরে আসা শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা এলাকার বাসিন্দা শাহিন হাওলাদার বলেন, এবার যেখানে আগুন লেগেছে তা বনের বেশ ভেতরে। দীর্ঘক্ষণ হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। গাছপালার মধ্যে হাঁটা যায় না। এখানে বনের মধ্যে ভালো ছিলাও (পায়ে হাঁটার পথ) নেই। গাছের কারণে কিছু জায়গা দিয়ে নিচু হয়ে চলতে হয়। রাজাপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য পান্না মিয়া বলেন, শত শত মানুষ আগুন নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের সাথে কাজ শুরু করে। আমিও সেখানে গেছি। বেশ দুর্গম পথ। আশপাশে কোন নদী খাল নেই। তাই পানি নিতে দেরি হচ্ছে। আগুন যেন না ছাড়ায় সে জন্য সরু পথ (ফায়ার লাইন) কাটা হয়েছে এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকা ধরে। সেখানে প্রচুর শুকনা পাতা, এটাই ভয়। তা না হলে দাউ দাউ করে কোথাও জ্বলছে না, আগুন আর ছড়ানোর কথা না। কিন্তু পানির পাইপ দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছে, আগুন লাগা ওই এলাকাটিতে তেমন বড় গাছ নেই। অধিকাংশই বলা বা বলই জাতীয় গাছ। এই গাছের শুকনো পাতার পুরু আস্তারন রয়েছে মাটির উপরে। ওই শুকনো পাতার কারণে আগুন থেকে থেকে ছড়াচ্ছে। আগুন যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, এ জন্য স্থানীয় লোকজন নিয়ে বন বিভাগ কিছুটা পাতার স্তুপ সরালেও গভীর ফায়ার লাইন কাটতে পারেনি। তাই রাতে বাতাস হলে দীর্ঘ বছর ধরে জমা পাতার স্তুপের নিচ দিয়েও আগুন ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে বলছে স্থানীয়রা।
পূর্ব সুন্দরবন চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্টার বিপুলেশ্বর দাস জানান, সকাল ৭টার দিকে কলমতেজী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন টেপারবিল নামক এলাকার বনের ওপর থেকে ধোয়ার কুন্ডুলি দেখতে পান স্থানীয় গ্রামবাসী। তারা অফিসে এসে এ খবর জানালে লোকজন নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান বনরক্ষীরা। তাৎক্ষণিক আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্নিকান্ড এলাকায় নালা কাটা শুরু করেন। যাতে বনের ব্যাপক এলাকায় আগুন ছড়াতে না পারে। স্টেশন কর্মকর্তা বিপুলেশ্বর জানান অগ্নিকান্ডের স্থান বন অফিস থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। কাছাকাছি কোথাও পানির কোন উৎস নেই। বনের খাল তার দূরত্বও ঘটনাস্থল থেকে দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার। জোয়ার হলে নৌপথে পাম্প মেশিন নিয়ে পানি দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়ার পর তারা রওনা দিয়েছে। অগ্নিকান্ডের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
শরণখোলা উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য পান্না মিয়া বলেন, শনিবার সকাল ৭টার দিকে সুন্দরবনের টেপারবিল এলাকার বনের ওপর থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে লোকজন তাকে জানায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তাকে জানানো হয়। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই। আগুন ততটা বেশি না, বেশি হলো ধোঁয়া। আগুন যেন আর না ছড়ায় এজন্য চারপাশ থেকে পাতা সরিয়ে সরু নালা করা হয়েছে। পাইপ এখনও ওই এলাকা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আশা করি সকালে আরও গতি নিয়ে কাজ করা যাবে।
এদিকে গত দুই যুগে অন্তত ২৬ বার আগুন লেগেছে সুন্দরবনে। আগুন লাগার পর কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে সেসব তদন্ত প্রতিবেদন ও দুর্ঘটনা এড়াতে করা সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে থামছে না সুন্দরবনে অগ্নিকান্ড। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের কটকায় একবার, একই রেঞ্জের নাংলী ও মান্দারবাড়িয়ায় দুইবার, ২০০৫ সালে পচাকোড়ালিয়া, ঘুটাবাড়িয়ার সুতার খাল এলাকায় দুইবার, ২০০৬ সালে তেড়াবেকা, আমুরবুনিয়া, খুরাবাড়িয়া, পচাকোড়ালিয়া ও ধানসাগর এলাকায় পাঁচবার, ২০০৭ সালে পচাকোড়ালিয়া, নাংলি ও ডুমুরিয়ায় তিনবার, ২০১০ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১১ সালে নাংলীতে দুইবার, ২০১৪ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১৬ সালে নাংলী, পচাকোড়ালিয়া ও তুলাতলায় তিনবার, ২০১৭ সালে মাদ্রাসারছিলায় একবার এবং ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ধানসাগর এলাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালের ৩ মে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারানি এলাকায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও স্থানীয়দের প্রায় ৩০ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় পরদিন ৪ মে বিকেল ৫টায় আগুন নিভে যায়। পরে ৫ মে সকালে আগের অগ্নিকান্ডের দক্ষিণ পাশে আবারও আগুন লাগে। এবার শনিবার (২২ মার্চ) সুন্দরবনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ি এলাকায় আগুন লেগেছে। সুন্দরবনের সবকটি আগুনের ঘটনাই শুষ্ক মওসুমে।
প্রতিবার আগুন লাগার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি গঠন করে বন বিভাগ। তদন্ত কমিটি নির্দিষ্ট সময়ে সুপারিশসহ রিপোর্টও পেশ করে। তবে সেসব থেকে যায় ফাইলবন্দী। সেই সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-৪০ কিলোমিটার খাল ও তিনটি পুকুর পুনঃখনন, আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের জনবল বাড়ানো, বনরক্ষীদের টহল কার্যক্রম জোরদার, তিনটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরি, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের দড়ি দিয়ে বেড়া নির্মাণ, রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও বনসংলগ্ন ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদী খনন করা। সুন্দরবন বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ নিয়ে অন্তত ২৬ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটলো।
সুন্দরবনে এসব অগ্নিকান্ডে তিলে তিলে নিঃশেষ হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে আগলে রাখা এই বন। বার বার আগুনে পোড়ে সুন্দরবন। এর পেছনে নানা স্বার্থান্বেষী মহলের হাত থাকতে পারে বলে মনে করেন সুন্দরবনপ্রেমীরা। একশ্রেণির অতিলোভী বনজীবীর লাগানো আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে সংরক্ষিত এই ম্যানগ্রোভ বনের একরের পর একর গাছপালা। অগ্নিকান্ডের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের বেশিরভাগে জেলে ও মৌয়ালদের বিড়ি-সিগারেট বা মৌমাছি তাড়াতে জ্বালানো মশাল থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে দ্বিমত আছে বনজীবীদের। অনেকের দাবি, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বন বিভাগের অসাধু একশ্রেণির কর্মচারীর সহায়তায় বনে আগুন ধরিয়ে দেয় অসাধু মাছ ব্যবসায়ীরা। পরে বর্ষা মওসুমে এসব স্থান প্লাবিত হলে নেট বা জাল দিয়ে সহজেই অধিক মাছ শিকার করে তারা।
সুন্দরবনের আগুন ‘মানবসৃষ্ট ও পরিকল্পিত’ বলে পরিবেশবাদী সংগঠন ও সুন্দরবনপ্রেমীরা বারবার দাবি করেছেন। তারা এ বিষয়ে সরকারকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী এডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, প্রতি বছর দাউ দাউ করে সুন্দরবন পুড়ে ছারখার হলেও টনক নড়ছে না বন বিভাগের। ঘটনার পর শুধু বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়। ফলে অগ্নিকান্ডর মূল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয় না। যে কারণে সুন্দরবনে গত দুই যুগে আগুন লাগার সঠিক কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। শাস্তি হয়নি অপরাধীদের। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সুন্দরবন গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, বারবার সুন্দরবনে আগুন লাগা উদ্বেগজনক। সুন্দরবনের ভূপ্রকৃতি এবং বর্তমান আবহাওয়া বিবেচনায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি প্রাকৃতিকভাবে ঘটেনি। এটি দুষ্কৃতকারীদের কাজ। ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।