নুরুল আজিম ইমতিয়াজ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিরামহীন মুষলধারে বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢল এবং মুখ্যজোয়ারে প্লাবিত গ্রামের পর গ্রাম। দীর্ঘ ৬দিন পর আকাশ ঝলমলে পরিষ্কার। টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল কমায় বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। সরল, জলদী, বাহারছড়া, কাথারিয়ায়,খানাখানাবাদ,বৈলছড়ি বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে কিছু এলাকায় পানি নামছে ধীর গতিতে। সেখানকার কিছু মানুষ এখনো পানিবন্দী।

প্রশাসনিক তথ্যমতে বাঁশখালীতে ৯৪ টি স্লুইস গেটের মধ্যে বেশিরভাগ অচল। ইতোমধ্যে ১৪ টি স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত পানি নামাতে ২০ টি জায়গায় বেড়িবাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। জোয়ারের পানি ডুকে যেন পুনরায় প্লাবিত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের উদ্যোগে বেড়িবাঁধ বাধা হচ্ছে।

কিন্তু পানি সরতেই ভেসে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। যে ক্ষত সহজে শুকাবে না। পানি নেমে যাওয়ার পর চিত্রটা বদলে গেছে। কোথাও ধসে পড়েছে বাড়িঘর, কোথাও ভেঙে গেছে রাস্তাঘাট। বাঁশখালীর প্রধান সড়কের বেশ কয়েক জায়গায় বড় বড় ফাটল। উপজেলার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক এখন চলাচলের অনুপযোগী।

গত মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে ছনুয়া গিয়ে দেখা যায়, বসতঘর থেকে পানি নেমে গেলেও কেউ ঘরে ফিরতে পারছে না। কাঁচা ঘরের ভেতর কাদা জমে একাকার। ঘরের তলা না শুকানো পর্যন্ত বসবাসের উপায় নেই।

বাঁশখালীর অর্থনীতির মেরুদ- ভেঙে দিয়েছে এই বন্যা। বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত, ফসলি জমি, মাছের প্রজেক্ট ও পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার, শ্যামল চন্দ্র জানান, “বাঁশখালী উপজেলায় পুরো চট্টগ্রামের ৩০ শতাংশ ফসল উৎপাদন হতো। তার পুরোটাই বন্যায় নিশ্চিহ্ন। কোথাও কোন সবজি ক্ষেত অবশিষ্ট নেই। মানুষের গোলায় রাখা শত শত আরি ধান বন্যার পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, এই বন্যায় উপজেলায় কিশোরসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়। প্রায় ৩০০০ ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১০ কোটি টাকার মাছের প্রজেক্ট পানিতে ভেসে গেছে। মুরগির ফার্মে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন জেলা শহর থেকে নিয়মিত ত্রাণ আসছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ চলছে। এখনো হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে। শনিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আগামী শুক্রবারের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বলা হয়েছে।

বন্যায় ভুক্তোভোগীরা বলছেন, “ত্রাণ পর্যাপ্ত হয়েছে। এখন আর ত্রাণ নয়। আমরা মাথাগোঁজার ঠাঁই চায়। আমাদের একটা ঘর চায়। শুক্রবারের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বলা হয়েছে। আমরা কোথায় যাবো? আমাদেরকে ত্রাণের পরিবর্তে পুর্নবাসনের উদ্যোগ নিন।

এদিকে গতকাল নৌকায় করে বন্যাকবলিত ছনুয়া এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, বাঁশখালীতে স্মরণকালের বন্যায় হয়েছে। বন্যায় যাদের ঘর-বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে তাদের মাঝে নগদ আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেন।পাশাপাশি তিনি বলেন, সরকারি সুযোগ সুবিধা ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে পর্যাপ্ত নয়, বেসরকারি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুর্নবাসন এগিয়ে আসার।

তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যে! প্রধানমন্ত্রীর কাছে বন্যাদুর্গত ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি সরকারি বরাদ্দের ২০০ মেট্রিক টন জি.আর চাল, ২০ লক্ষ নগদ টাকা, ২০০ বান টিন দেওয়ার জন্য ডিও লেটার প্রদান করেছি।

পানি কমছে, কিন্তু বন্যায় দুর্গত মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। শুক্রবার আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা বন্ধ হলে ৩০০০ পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথায় হবে, তার উত্তর এখনো মেলেনি।