ইবরাহীম খলিল
দুই চোখ হারিয়ে আমি এখন জিন্দা লাশ। মানুষের সাহায্য নিয়ে চলাফেরা করি। হাত ছেড়ে দিলে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমার দৃষ্টিতে জুলাই আন্দোলন মূল্যায়ন করতে গিয়ে রাষ্ট্র অন্ধের মতো এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য দ্্ুই চোখ দিয়েছি। অনেকে জীবন দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা আহতরা যথাযথ মূল্যায়ন ও গুরুত্ব পাইনি। কথাগুলো দৈনিক সংগ্রামের সাথে বলছিলেন, নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় জুলাই আন্দোলনে দুইচোখ হারানো মাহবুব আলম।
২০২৪ইং এর জুলাইযুদ্ধে দুই চোখ হারিয়েছেন। এরপর সংসার হারিয়েছেন অর্থাৎ স্ত্রী তাকে ছেড়ে অনত্র চলে গেছেন। এখন সংসারে অন্য মানুষের সহায়তায় জীবন যাপন করেন মো. মাহবুব আলম। কিন্তু তারা মনের জোর কমেনি একটুও। কথা বলেন শক্ত করে। স্বপ্ন দেখেন ফ্যাসিবাদম্ক্তু সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। তার দৃষ্টিতে জুলাইয়ের আকাঙ্খা আর বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেক ফারাক। তবে এখনো জুলাইয়ের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি। কারণ বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কোন দলের পক্ষেই একদিনে বাংলাদেশের চিত্র বদলে ফেলা সম্ভব না। দৈনিক সংগ্রামের সাথে জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
কথা প্রসঙ্গে মাহবুব আলম বললেন, অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। অপশন ছিল ভাল অনেক কিছু করার। সত্যি কথা হলো- চাওয়া-পাওয়াতে অনেক গ্যাপ আছে। কাজ করার জন্য প্রচন্ড মানসিক ইচ্ছা দরকার। দুই চোখ হারানো মো, মাহবুব আলম থাকেন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার মিশনপাড়া এলাকায়। তিনি বলেন আমি এখন একটা জীবন্ত লাশের মতো। আমি মা-বাবার বড় ছেলে এবং একমাত্র ছেলে সন্তান। সরকারী তোলারাম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরার কথা ছিল। কিন্তু ততক্ষণে ২০২৪ ইং সালের জুলাইযুদ্ধ এসে যায় জীবনে।
ফটোগ্রাফির শখ ছিলো। তাই জুলাই আন্দোলনের ছবি তুলতে যাই। গলি পথে উঁকি দিতেই পুলিশ গুলি চালায়। তাতে নিভে যায় দুই চোখের আলো। মাহবুব আলমের আফসোস ৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে এসে যুদ্ধটা করতে হয়েছে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের ছররা গুলিতে দুই চোখের আলো নিভে যায় মাহবুব আলমের। দুই বছর পেরিয়ে গেছে, দেশে-বিদেশে চিকিৎসা করিয়েও চোখের আলো ফেরেনি। উন্নত দেশে চিকিৎসা করানো গেলে কিছুটা সম্ভাবনা আছে; কিন্তু পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
মাহবুব আলম নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। জুলাই আন্দোলনে চোখ হারানোর পর থেকে একা চলাফেরা করতে পারেন না, সব সময় সহায়তা প্রয়োজন হয়। চোখ হারানোর আট মাস পর স্ত্রীও ছেড়ে গেছেন। চোখ নেই বলে ফ্যাসিস্টমুক্ত নতুন বাংলাদেশ দেখতে পাচ্ছি না। আমি চাই জুলাইয়ের আকাঙ্খার বাংলাদেশ।
মাহবুবের কথায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে চাষাঢ়া মোড় ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা। মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। সেদিন হি পুলিশ ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা ও এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। সেদিন ছোট একটি বাচ্চা ছেলে অসুস্ত হয়ে পড়লে হাসপাতালে নিয়ে যান মাহবুব। ফিরে দেখি এলাকা নিরব। এর ৫মিনিট পর দেখি হকারদের গুলি করছে পুলিশ। এরর্প আমি একটু উঁকি দিয়ে দেখতে যাই মেইন রোডে পুলিশের অবস্থান। সাথে সাথে ফায়ার করে পুলিশ। গুলি লাগে বাম চোখে। তাতে চোখের মেইন নার্ভ ডেমেজ হয়ে যায়। চোখের পর্দা ফেটে যায় এবং গুলি মাথার হাড় ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেছে। মাহবুবের মাথার বাঁ পাশে এখনো ৩২টি এবং চোখের ভেতরে ৯টি ছররা গুলি রয়ে গেছে।
রাজধানীর চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ভারতের চেন্নাই এবং থাইল্যান্ডে তাঁর চিকিৎসা হয়; কিন্তু চোখের আলো ফেরেনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আপাতত আর দেখতে পাবেন না তিনি। জার্মানি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু আর্থিক সংগতি না থাকায় সেদিকে আর পা বাড়ায়নি পরিবার। যুক্তরাষ্ট্র বা জার্মানিতে নিতে পারলে মাহবুবের চোখের আলো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু মাহবুুব আলমদের সেই সামর্থ্য নেই।
২০২৪ সালের পর আরও দুই বার জুলাই এসেছে। কিন্তু মাহবুবের চোখের আলো ফিরেনি। আর ফিরবেও না। আর কত মানুষের চোখের আলো নিভে গেলে দেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে সেই প্রশ্ন অসংখ্য আহত জুলাইযোদ্ধাদের।