আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তবে পরিবেশ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজতে গিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সূচনা হয় ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্বব্যাপী এ দিবস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, বর্তমানে বিশ্ব পরিবেশের সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের হ্রাস এবং দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বনভূমি ধ্বংস ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য ও বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশে ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তারের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দেশের ধান উৎপাদন ৬ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির মাছ ও কৃষি জমি হুমকির মুখে পড়ছে। সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। বহু মানুষকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আইলা, সিডর, আম্পান ও ইয়াসের মতো দুর্যোগের ক্ষত এখনও বহন করছে উপকূলবাসী।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, অব্যাহত লবণাক্ততা, নদী দখল, জলাবদ্ধতা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে সাতক্ষীরা ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। জেলার ঐতিহ্যবাহী সায়ের খাল বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং শহরে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটি জেলার পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় ২১ দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে পেশ করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরাকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা, প্রাণ সায়ের খাল উদ্ধার, নদী দখলমুক্তকরণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ বলেন, “পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সাতক্ষীরার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নাগরিক সমাজের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ রোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এছাড়া পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী-খাল পুনঃখনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, জলাশয় সংরক্ষণ, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার প্রসার জরুরি। একই সঙ্গে সুন্দরবন রক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় আমরা সরকারের কাছে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়েছি। উপকূলবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষায় শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সুপেয় পানির সংকট নিরসন, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের সহযোগিতায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে বলে আমরা আশাবাদী।” বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সাতক্ষীরাবাসীর প্রত্যাশা পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য সাতক্ষীরা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।