জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২২ সালে এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের কাঠামো অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ফার্মাসিস্টসহ অন্তত ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। রয়েছে নরমাল ডেলিভারিসহ তিন শয্যার ওয়ার্ড ও আবাসিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানে প্রধান ফটকের তালা খুলে বসে থাকেন শুধু একজন আয়া। চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করে করে ফিরে যান রোগীরা। এই পরিস্থিতিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটিতে চিকিৎসা সেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। অথচ সকাল ৮টার মধ্যে উপস্থিত থাকার কথা সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর। এ সময় আয়া আবেদা খাতুন বলেন, "ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কোনো ডাক্তার নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের শুধু একজন স্যাকমো সিয়াম আছেন। তিনিও অসুস্থ থাকায় আসেন না। আমি শুধু চাকরি বাঁচানোর জন্য বিকেল ৩টা পর্যন্ত তালা খুলে বসে থাকি। রোগীরা এসে সারাদিন ফিরে যায়।"

স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসা রোগী আমেনা খাতুন বলেন, "শরীরে জ্বর-ঠান্ডা। সকাল থেকে বসে আছি। ১০টার দিকে আয়া এসে দরজার তালা খুলল। বলল আজ নাকি ডাক্তার আসবে না। এত কষ্ট করে এসে এখন খালি হাতে ফিরে যাব?" তিনি যদুবয়রা গ্রামের দিনমজুর আতিয়ার রহমানের স্ত্রী।

দুই সন্তানের পর আবারও পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা যদুবয়রা স্কুলপাড়ার ভ্যানচালক রাকিবের স্ত্রী শারমিন আক্তার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "সরকার এতো টাকা দিয়ে ভবন করেছে, অথচ একদিনও মহিলা ডাক্তার আসে না। ঠিকঠাক ওষুধ পাওয়া যায় না। শনিবারে মহিলা-পুরুষ কোনো ডাক্তারই থাকে না। মানুষ এসে এসে ফিরে যাচ্ছে। হয় ভালোভাবে সেবা দিক, নয়তো হাসপাতাল বন্ধ করে দিক।"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির উপ-সহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (স্যাকমো) মিজানুর রহমান সিয়াম জানান, প্রায় তিন মাস ধরে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে ছুটিতে আছেন। সপ্তাহে তিন দিন তিনি আসেন এবং অন্য দিনগুলোতে অন্য জায়গা থেকে দুজন আসেন। তিনি আরও জানান, ভবন থাকলেও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে জনবল নেই। তিনি একাই কখনও চিকিৎসক, কখনও ফার্মাসিস্ট, আবার কখনও বা ঝাড়ুদারের কাজ করেন।

জানা গেছে, প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি এক সময় বিদেশি সংস্থা 'নেদারল্যান্ডস রেড ক্রস'-এর আওতাধীন ছিল। সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন চলে আসে। সেখানে একটি জরাজীর্ণ ভবনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সীমিত জনবল দিয়ে সেবা চলছিল। এরপর পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর লক্ষ্যে ২০২০ সালে প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণ করে সরকার। ভবনটি ২০২২ সালে উদ্বোধন করা হলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবকাঠামো থাকলেও জনবল নেই। আবার যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারাও সময়মতো আসেন না। চাহিদামতো ওষুধও মেলে না। ফলে সেবা না পেয়ে প্রতিদিনই ফিরে যাচ্ছেন রোগীরা। তারা দ্রুত কেন্দ্রটিতে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর দাবি জানান।

কুমারখালী উপজেলার সান্দিয়ারা-লাহিনীপাড়া জিকে খালের সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি। সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে দুইটি আবাসিক ও একটি স্বাস্থ্য ভবন। দোতলা নতুন ভবনটিতে সুনসান নীরবতা। নিচতলায় চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ড, নরমাল ডেলিভারি ও ওয়াশরুমের দরজাগুলোতে ঝুলছে তালা। দ্বিতীয় তলায় দুইটি আবাসিক কক্ষ ব্যবহার না হওয়ায় সেখানে ময়লা, আবর্জনা ও মাকড়সা বাসা বেঁধেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা খাতুন বলেন, "১০/১১টার আগে ডাক্তার আসে না। আসলেও ওষুধ পাওয়া যায় না। গর্ভবতী মহিলারা কোনো সেবা পায় না। এখানে সেবা চালু হলে গর্ভবতীদের আর কুমারখালী বা কুষ্টিয়া নেওয়া লাগত না।" নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, "ডাক্তার আসে না, এক আয়া তালা খুলে বসে বসে কাঁথা সেলাই করে। মানুষ কষ্ট করে এসে ফিরে যায়। এসব দেখার লোক নাই।"

যদুবয়রা জয়বাংলা বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভবন করেছে, থাকা ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ডাক্তাররা না থাকায় সেসব নষ্ট হচ্ছে এবং মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামীমা আক্তার বলেন, জনবল সংকট রয়েছে। একজন স্যাকমো সেবা দিচ্ছিলেন, তিনিও অসুস্থ থাকায় শনিবার সেবা বন্ধ থাকে। তবে সরকারি ভবন বন্ধ রাখার সুযোগ নেই বলেই আয়া তালা খুলে বসে থাকেন।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস এম সানবিম সোহান বলেন, জনবল সংকটের কারণে শুধু একজন ভিজিটর মাসে একদিন রোগী দেখেন। এতে স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, "জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জেনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন।