গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ায় পৌঁছলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়

স্টাফ রিপোর্টার

এক রাশ প্রত্যাশা নিয়ে মালয়েশিয়া-চীন সফর শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। এর অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে সরকারি সফরে মালয়েশিয়া গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (কেএলআইএ) অবতরণ করে। বিমানটি নামার পর মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।

বিমানবন্দরে মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী ড. জুলকিফলি হাসান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান। পরে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এসময়, মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরীসহ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও রয়েছেন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, মালয়েশিয়া ও চীনের রাষ্ট্রদূতসহ ঊধ্বর্তন সরকারি কর্মকর্তারা।

মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সফরে শ্রম বাজারকে ‘এক নম্বর এজেন্ডায়’ রাখা হয়েছে। কুয়ালামপুরের এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আগেই জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এছাড়া মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের অনুরোধ এবং বাংলাদেশিদের কল্যাণের বিষয়ে অনুরোধ জানানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর নিয়ে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সফরের প্রথম দিন ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়ায় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হবে। পরদিন ২২ জুন পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম একান্ত বৈঠক এবং পরে উভয় দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বি-পক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের আসিয়ানের ‘ডায়ালগ পার্টনার এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ-আরসেপে’ যোগদান করার আবেদন জোরালোভাবে তুলে ধরে মালয়েশিলার সমর্থন চাওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকালে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, কর্মী প্রেরণ, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও কৃষি, শিক্ষা ও জন-যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার তথ্য দেন পররাষ্ট্র সচিব। কর্মসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আজ সোমবার দুপুরে কুয়ালালামপুর থেকে দালিয়ানের উদ্দেশে যাত্রা করবেন এবং সন্ধ্যায় সেখানে পৌঁছাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেনÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এছাড়াও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার) তানভীর গণি ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।

সফরের সূচি ও গুরুত্ব

কুয়ালালামপুর সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষ করে সোমবার দুপুরের পর প্রধানমন্ত্রী চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা হবেন। আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিনি চীন সফর করবেন।

মালয়েশিয়া সফরে যা গুরুত্ব পাচ্ছে

বাংলাদেশের একটি বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। তবে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে পারে। এ ছাড়া নতুন সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে জোর দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শিল্প, অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হতে পারে। এদিকে মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল অর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং কেন্দ্র। বাংলাদেশ হালাল পণ্য রপ্তানি, ইসলামি ফাইন্যান্স এবং শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে।

এছাড়া মালয়েশিয়া আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে আরও গভীর প্রবেশের চেষ্টা করছে। কুয়ালালামপুর সফরকে আসিয়ানভিত্তিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বৃদ্ধির একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে।