ইবরাহীম খলিল নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে, : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেছেন, ব্যাংক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে নিজ দলীয় লোক বসিয়ে সরকার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের জনগণ এ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা মেনে নেবে না। এসময় তিনি সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে পরিচালনা করার দাবি জানান। একই মঞ্চে তিনি মাওলানা জব্বারকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

গতকাল শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ জেলা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে বিশাল কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখা এই কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা মো. আবদুল জব্বার। পরিচালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসাইন। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে ইসলামী সংগীত পরিবেশন করা হয়।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুল ্আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. কামাল হোসাইন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের সাবেক আমীর মঈনুদ্দিন আহমেদ, নায়েবে আমীর আবদুল কাইয়ুম, নারায়ণগঞ্জ জেলা আমীর মোমিনুল হক সরকার, শহীদ মো. আবিলের পিতা আবুল কালাম ও ঢাকা জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান প্রমূখ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সময়ে সংসদে বিরোধী দলকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতো আওয়ামী লীগ। তারা সবচেয়ে বেশি বলতো বিএনপিকে তারপর জামায়াতে ইসলামীকে। বর্তমান সরকারও বিরোধী দলকে বিভিন্ন রকমের ট্যাগ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু দেশের জনগণ এগুলো খায় না। সরকারকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আপনারা তরুণ সমাজের ভাষা বুঝার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগের পথে হাঁটবেন না।

তিনি বলেন যারা আজকে শহীদ পরিবার পঙ্গু ভাইবোনদের প্রতি অবজ্ঞা উপহাস করে কথা বলেন তারা নিজেদের সাথে প্রতারণা করার শামিল।

নারায়ণগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে ডা.শফিকুর রহমা বলেন, কালো টাকা ভয়ভীতি প্রদর্শন, ইঞ্জিনিয়ারিং সবকিছুকে উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জে ১১ দলীয় জোটকে একটি আসনে জয়ী করেছেন। ভোট গ্রহণ যেভাবে সুষ্ঠু হয়েছে ভোট গণনা এবং রেজাল্ট যদি সুষ্ঠু হতো তাহলে বাকী আসনেও জোটের বিজয় হতো। কারণ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে বাসে গাড়িতে লঞ্চে রাস্তাঘাটে সব জায়গায় একই আওয়াজ উঠেছিল দাঁড়িপাল্লা দাঁড়ি পাল্লা।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর উল্লেখ করেন একইদিনে দুটি ভোট হয়েছে। এর মধ্যে গণভোট নিয়ে প্রথমে না এর পক্ষে ছিল বিএনপি। পরে বাধ্য হয়ে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন আপনারা গণভোটে হ্যাঁ তে ভোট দিবেন। একবারই তিনি প্রথম এবং শেষবারের মতো একথা বলেছেন। এরপর জনগণ ৬৭ ভাগের বেশি ভোট দিলো। তিনি সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্র এবং দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি এর কি মূল্য দিলেন? সেই প্রশ্ন রাখেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেছেন নির্বাচনটা যাতে হয়ে যায় সেজন্য একথা বলেছি। এটা লজ্জার। একটা সংগঠনের শীর্ষ জায়গা থেকে যদি জনগণকে ধোকা দেওয়া হয়,তাহলে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কিভাবে রাখবে ? মানুষ কেন রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করবে ? আমরা সেই রাজনীতি করি নাই, করবোও না।

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার ইতিমধ্যে অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। বিভিন্নস্থানে দলীয় লোক বসিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করতে চাইছে। একদলীয় শাসন জনগণ মেনে নিবে না। যে কথাগুলো বলে আওয়ামী লীগ গিয়েছে দিল্লীতে। তরুণ সমাজের মুখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের সাথে প্রতারণা করে দেশ শাসন করলে জনগণে আপনাদের বিরুদ্ধে দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যাবে। শেখ মুিজবুর রহমানও ্একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। অর্ধ বছরও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি।

বিরোধী দলকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে ডা.শফিকুর রহমান বলেন, কাজটি করতে করতে আওয়ামী লীগ গিয়ে পড়েছে দিল্লীতে। আপনারা কোথায় গিয়ে পরবেন ? জনগণ এগুলো চায় না। জনগণের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন; নইলে ভুল করবেন।

বাজেট প্রসঙ্গে ডা.শফিকুৃর রহমান বলেন,সরকার একটা বড় বাজেট দিয়েছে। বাস্তবায়ন করবে সরকার। আওয়ামী লীগ বড় বাজেট দিয়ে ১৭ বছরে ২৯ লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। আপনারাও তা করবেন না। জনগণ মেনে নিবে না। তিনি বলেন, দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে; তাহলে জনগণ জনগণের কাতারে থেকে যাবে। একটি গোষ্ঠির ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। জনগণের না।

নারায়ণগঞ্জের ব্যাপারে জামায়াত আমীর বলেন, এক সময় এ্ই জেলাকে প্রাচ্যের ডান্ডি বলা হতো। এটা ছিল রাজধানী আর ঢাকা ছিল প্রশাসনিক রাজধানী। নারায়ণগঞ্জ তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। মাঝখানে সন্ত্রাসের রাজধানীর পরিচিতি পেয়েছে। ত্বকী হত্যা নিয়েও কথা বলেন, জামায়াত আমীর। তিনি বলেন আপনারা ত্বকী হত্যার বিচার পেয়েছেন? মাঠ থেকে জবাব আসে না না------। ছুপ ছুপ রক্ত আর কাড়ি কাড়ি লাশ এখানে উপহার দেওয়া হয়েছে। এরপর কোন কোন এখানে বলতেন খেলা হবে। এখন আর কেউ বলে না খেলা হবে। এখন আর খেলা হবের কথা কেউ বলে না। তবে এখানে এখন চলছে বোবা কান্না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তাড়া করছে। মুখ খোলে কথা বলতে চান না। কিনতু চোখের ভাষা বোঝা যায়। চাঁদাবাজরা ব্যবসায়ীদের ভাল থাকতে দিচ্ছে না। নেতারা বলে দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবো আর ঘরে ঘরে চাঁদাবাজ লেলিয়ে রেখেছে। কথার সাথে কাজের মিল নেই। মদের বিপনন এবং উৎপাদনকারীর কেবল হাত বদল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ডা.শফিকুর রহমান। আমরা তাদের চিনি। জনগণ সময় মতো জবাব দিবে।

তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমীর আবদুল জব্বারকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, আমরা নারায়ণগঞ্জকে স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন মর্যাদাশীল নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তাই এখানে দরকার ভাল মানুষ। এমন মানুষের প্রয়োজন হবে যে আল্লাহকে ভয় করে। যার যে হক তার হাতে পৌছে দিবে। আমরা সৎ নেতৃত্ব তৈরি করবো ইন শা আল্লাহ। আবদুল জব্বারের ব্যাপারে তিনি বলেন তার চোখে এবং স্বপ্নে মানুষের কল্যাণ। আগামীতে যাতে ভোট জালিয়াতি না হয়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমার বিম্বাস নারায়ণগ্ঞ্জবাসী সৎ যোগ্য মানুষকেই ভোট দিবে।

কর্মী সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই। সবাই যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। আমরা হাল ছাড়ি নাই। ভয় দেখিয়ে আমাদের পথ থেকে বিরত রাখা যাবে না। আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই। ন্যায় ইনসাফের বাংলাদেশ চাই। যেজন্য জীবন দিয়েছিল আবু সাঈদ মুদ্ধ। সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।

নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সৎ যোগ্য নাগরিক তৈরির মাধ্যমে মানবিক দেশপ্রেমিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে অবদান রেখেছে। এজন্য নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। গত নির্বাচনকে দেশের জনগণ ভোট দিলেও ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। সংসদে কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ভয় পায় না। নতুন করে ফ্যাসিবাদী আচরণ করলে জনগণকে সাথে নিয়ে রুখে দিবো। তিনি নারায়ণগঞ্জে সংগঠনকে আরও মজবুত করার আহ্বান জানান।

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আন্দোলনকে আল্লাহ সহজ করেন নাই। আন্দোলন যত বড় থাকে, যড়যন্ত্র বাড়তে থাকে। সব একসাথে হয়ে ষড়যন্ত্র করবে। জামায়াতে ইসলামীর কাজ হচ্ছে সামনে এগিয়ে যাবে। যারা ধ্বংস করে দিতে চায় তাদের বুকে টেনে নিবো। তিনি সমাজের সমস্যা সমাধানের কাজ করতে জামায়াতের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, অবহেলার কারণে নারায়ণগঞ্জ উন্নতি হয় না। আমরা সমস্ত শক্তি দিয়ে এ জেলার জনগণের অধিকার আদায় করে ছাড়বো। নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে জনগণের নির্বাচিত প্রয়োজন জানিয়ে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানান।

মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন-সংগ্রাম ও শহীদদের আত্মত্যাগের কারণেই ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ না হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হওয়ার কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরের রয়েল পার্টি সেন্টারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত বার্ষিক সদস্য (রুকন) সম্মেলন-২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মুন্সীগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর আ. জ. ম. রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এবং জেলা সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন রাজির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের পরিচালক ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭, ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালের মতোই ২০২৪ সালেও বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি জাতির গভীর কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত এবং তাদের অবদানকে কখনো ছোট করে দেখা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ হয়েছিল বলেই ২০২৬ সালের নির্বাচন হয়েছে। ২০২৪ না হলে ২০২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তাদের রক্তের বিনিময়েই আমরা সরকারি ও বিরোধী দলের অবস্থানে এসেছি। শহীদদের কেউ যেন অবমূল্যায়ন না করেন, এটাই আমার অনুরোধ।’

তিনি বলেন, অতীত আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণভোট প্রসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন তুললেও জনগণই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। দীর্ঘ সময় দেশ স্বৈরশাসনের কবলে ছিল এবং জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত জানিয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে সকল সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ব্যবসায়ীদের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, নরায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার চিত্র পেয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।