সংসদে ব্যারিস্টার নাজিবুর

সংসদ রিপোর্টার

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘সবচেয়ে বড় বাজেট’ হিসেবে মানতে নারাজ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। স্বর্ণের দামের সঙ্গে তুলনা করে তিনি দাবি করেছেন, মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে বাজেটের আকার বাড়েনি; বরং এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট। বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নে আমাদের অংশগ্রহণ কতটুকু? আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু রবার স্ট্যাম্পের মতো বাজেট পাস করি। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অর্থবিল সংসদে আসার আগে স্থায়ী কমিটিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। আমাদের এখানে আমলারা বাজেট বানান, আমরা কয়েক মিনিটের গলাবাজি করি মাত্র। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।

গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাজিবুর রহমান বলেন, বলা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। আসলে কি তাই? ১৯৭২ সালে আমাদের বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা।

তখন স্বর্ণের ভরি ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। আজকে স্বর্ণের দাম ১৪০০ গুণ বেড়ে হয়েছে ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা। সেই তুলনায় বাজেট বেড়েছে মাত্র ১২০০ গুণ। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে বাজেটের পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে বাড়েনি। এই বাজেটকে বড় বাজেট বলা যাবে না, তবে একে বলা যাবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট।

বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নে আমাদের অংশগ্রহণ কতটুকু? আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু রবার স্ট্যাম্পের মতো বাজেট পাস করি। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অর্থবিল সংসদে আসার আগে স্থায়ী কমিটিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। আমাদের এখানে আমলারা বাজেট বানান, আমরা কয়েক মিনিটের গলাবাজি করি মাত্র। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।

ঘাটতি মেটাতে দেশীয় ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যের সমালোচনা করে নাজিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর অবস্থা এখন নাজুক। ইসলামী ব্যাংক থেকে সাত দিনে ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে মানুষ। সরকার টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে ধার দিচ্ছে। এই অবস্থায় ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিলে দেশের অর্থনীতির ১২টা বাজবে।

বাজেটকে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৪ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ কর দেন। কিন্তু ভ্যাট দেন দেশের আপামর জনসাধারণ। চাল-ডাল কিনতে একজন ভিক্ষুক যে পরিমাণ ভ্যাট দেন, একজন কোটিপতিও একই পরিমাণ দেন। ২০টি আইটেমের ওপর ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে। এটি কখনোই গরিববান্ধব বাজেট হতে পারে না।

আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর ফলে মধ্যবিত্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুর্নীতি ও লুটপাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এডিসিপি বরাদ্দের ৫০ শতাংশও উন্নয়নের কাজে লাগে না। জবাবদিহিতা ও সক্ষমতা যাচাই ছাড়া এই বিশাল বরাদ্দ আসলে ‘হরিলুটের’ পরিকল্পনা।

নাজিবুর রহমান বলেন, বাজেটের বড় অংশ খরচ হচ্ছে সুদ পরিশোধে। আমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল এই সুদের বোঝা মাথায় নিতে চাই না। দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে আমাদের সুদের ওপর নির্ভর করতে হতো না। যাকাত থেকে ২ লাখ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করলে দারিদ্র্য বিমোচন সহজ হবে।

আলোচনায় তিনি নদী ও জলাশয় রক্ষায় ‘জাল যার জলা তার’ নীতিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে (যেমন: ইসলামী ব্যাংক) ধার দেওয়া হচ্ছে। এমন ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাকে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। বিদেশ থেকে যে ঋণ আনা হবে, সেগুলোর শর্ত ও তা মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট কৌশল বাজেট ডকুমেন্টে অনুপস্থিত বলে তিনি দাবি করেন। ওগঋ বা বিশ্বব্যাংকের শর্ত মানলে জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তিনি আরো বলেন, দেশের মাত্র ২৪ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ কর দেন। বিপরীতে মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮% আসে ভ্যাট থেকে, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে দিতে হয়। গ্যাস সিলিন্ডারসহ ২০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

কিডনি ডায়ালিসিস ফিল্টারের অগ্রিম কর মওকুফের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাদানকারী ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল’-এর লাইসেন্স বাতিলের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

উন্নয়ন বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তৃণমূলের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় এডিপি বরাদ্দের ৫০% অংশও প্রকৃত উন্নয়নে কাজে লাগে না।

তিনি আরো বলেন, সংবিধানের ৯০ ও ১৩২ ধারা এবং ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী প্রতি বছর এপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাকাউন্ট সংসদে পেশ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিগত ৬ বছর ধরে (২০১৯-২০২৫) খরচের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। দেশের সম্পদের সিংহভাগ (১০% মানুষের হাতে ৫৮% সম্পদ) মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বিকল্প অর্থনৈতিক মডেলের প্রস্তাব করেন। সুদের অভিশাপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে পর্যায়ক্রমে সুদভিত্তিক ঋণ থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে একটি কার্যকর যাকাত ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করে গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, কেবল দেশের ব্যাংকিং খাত থেকেই প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা যাকাত আদায় সম্ভব, যা দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখবে।