জেলা-মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্যদের শিক্ষাশিবিরে ডা. শফিকুর রহমান
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও সামাজিক বাধা। তিনি বলেন, মুসলিমরা সার্বজনীন গোষ্ঠী। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তাদেরকেই বলা হয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতের মধ্যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা একটি নেয়ামত, যা অন্য কোনো সংগঠনে নেই। এই সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা, নীতি-নৈতিকতা ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা রয়েছে। মানুষের সারা জীবনের সুনাম ও অর্জন একটি ছোটখাটো দুর্ঘটনা ম্লান করে দিতে পারে।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর জেলা-মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্যদের নিয়ে তিন দিনব্যাপী শিক্ষাশিবিরের শেষ দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকীর সঞ্চালনায় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত শিক্ষাশিবিরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা পেশ করেন সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
আমীরে জামায়াত বলেন, এই উপমহাদেশে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে মুসলমানরা। এর ফলে ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৮৬ বছরের অভিযাত্রায় অসংখ্য নেক বান্দা যুক্ত ছিলেন। তাদের ত্যাগ, কুরবানি ও সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং অনেকেই শহীদ হয়েছেন। আল্লাহর পথে তাদের ত্যাগ ও কুরবানির ফল এ জাতি পাবে, ইনশাআল্লাহ। তিনি আরও বলেন, আল্লাহকে ডাকতে হবে এক্বিন ও ইখলাসের সাথে। এক্বিন ও ইখলাস যেখানে একসাথে থাকে সেখানে কোনো ফারাক থাকে না।
আমীরে জামায়াত বলেন, জামায়াতের মধ্যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা একটি নেয়ামত, যা অন্য কোনো সংগঠনে নেই। এই সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা, নীতি-নৈতিকতা ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা রয়েছে। মানুষের সারা জীবনের সুনাম ও অর্জন একটি ছোটো-খাটো দুর্ঘটনা ম্লান করে দিতে পারে বলেও তিনি শিক্ষাশিবিরের ডেলিগেটদের স্মরণ করিয়ে দেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উপমহাদেশের চারটি দেশের মধ্যে আমাদের এ সংগঠনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলো এসেছে। অন্যদিকে ভারতে মুসলমানরা নিরাপদ নয়। তারা সবসময় জানমাল, ইজ্জত ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মুসলিমরা সবসময় লড়াই করে যাচ্ছেন এবং তাদের রক্ত দিতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও সামাজিক বাধা। মুসলিমরা সার্বজনীন গোষ্ঠী। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তাদেরকেই বলা হয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী।
বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিষয়ে তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনসহ আমরা ৯০টি আসন নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি। নির্বাচনে মানুষ প্রত্যাশা করেছিল যে, তারা একটি দুর্নীতিমুক্ত দলকে দায়িত্ব দেবে; যারা সমাজকে দুর্নীতি মুক্ত করবে। জামায়াতই একটি দল যারা এর উপযুক্ত। আল্লাহ আমাদের যতটুকু যোগ্য মনে করেছেন, ততটুকু দায়িত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য যদি হয় জামায়াতকে ক্ষমতায় আনা, তাহলে আমাদের ব্যাপ্তি দুনিয়া পর্যন্ত। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়- তাহলে তার ব্যাপ্তি হবে আখিরাত পর্যন্ত। যিনি দেশ চালানোর সক্ষমতা রাখেন তার হক গোটা দেশের। দেশের অভ্যন্তরে থাকা পশুত্বকে দমনের আগে নিজের ভিতরের পশুত্বকে দমন করার আহ্বান জানান আমীরে জামায়াত। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ ও আল্লাহর কিতাবকে যারা আঁকড়ে ধরেন তারা কখনো পথ হারান না। আমাদের দুর্বল ঘর মজবুত করতে হবে। তা কেবল আল্লাহর নেয়ামতেই সম্ভব হবে। নারী ও পুরুষের সমন্বয়েই আমাদের সমাজ, সংগঠন ও দেশ। আমাদের মায়েদের সম্মান করতে হবে, তাদের কাজে সহযোগিতা করতে হবে ও দ্বীনের কাজে এগিয়ে আনতে হবে।
স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সমাজ থেকে ভালো মানুষগুলোকে বাছাই করে নিতে হবে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানবিক যোগ্যতাসম্পন্নদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে যারা হালাল উপার্জন এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা রাখেন- তাকেই বাছাই করতে হবে; তিনি যে স্তরের জনশক্তিই হোন না কেন। এর মাধ্যমে সেখানে দায়িত্বশীল তৈরি হবে। পরিশেষে কর্মপরিষদের সদস্যদের সংশ্লিষ্ট আমীরকে সহযোগিতা, পরামর্শ দান এবং নিজ বিভাগের কাজ সুন্দরভাবে করার আহ্বান জানিয়ে এবং সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।
জুলাই সনদ নিয়ে ছেড়ে কথা বলবো না
মানুষের অধিকারের পক্ষে; ন্যায়-ইনসাফ, দ্বীন, কালিমা, সততা, সত্য ও এলাকার মানুষের স্বার্থের পক্ষে সব সময় আপসহীন থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি শুক্রবার রাতে রাজধানীর মিরপুরে একটি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের কাফরুল জোন আয়োজিত বাছাইকৃত কর্মীদের নিয়ে এক শিক্ষা শিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকের সভাপতিত্বে এবং সহকারী জোন পরিচালক শহীদুল্লাহর পরিচালনায় শিক্ষাশিবিরে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মুহাম্মদ আব্দুর রব, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মুসা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. আব্দুস সামাদ। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের কর্মপরিষদ সদস্য শাহ আলম তুহিন ও উপাধ্যক্ষ আনোয়ারুল করিম প্রমুখ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত নির্বাচনে জাতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করেছিলো। সে লক্ষ্যে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করা হয়েছিলো গণরায়ও। দেশে ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু দুষ্ট লোকেরা আঁতাত করে জনগণের দেওয়া সে রায় ছিনতাই করে নিয়েছে। তবে আমরা হতাশ হয়নি। এর মধ্যে আল্লাহ অবশ্যই আমাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। বিগত নির্বাচনের ভুল ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ আমরা পেয়েছি। এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারলে আগামী দিনে আমাদের বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে আরো শানিত করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম অর্জন। কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়ন না করে গণরায়ের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে। তবে তা বাস্তবায়ন হবে- ইনশাআল্লাহ। হয়তো আপনারা ভাবছেন সময় তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর চাইলে সবই সম্ভব। তার সময় এখনো শেষ হয়নি। আর এ বিষয়ে আমরা কোন আপস করবো না; ছেড়ে কথা বলবো না। মূলত, জুলাই সনদ নিয়ে কোন আপস করা হলে তা জাতি ও শহীদদের সাথে বেঈমানী করা করা হবে। শহীদদের আত্মা কষ্ট পারে। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সকলকে আপসহীন ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, সংসদে আমাদেরকে হুমকী দেওয়া হচ্ছে। মহল বিশেষের মর্জি মত না চললে ‘এ করা হবে; সে করা হবে’। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত আমরা এসব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছি। তাই এসবকে আমরা কোন ভাবেই ভয় করি না।