• বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে
  • রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হবে
  • নিত্যপণ্যে শুল্ক কমিয়ে বিলাসী পণ্যে শুল্ক বাড়নো হয়েছে
  • ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণে বিনিয়োগ কমার ঝুঁকি থাকবে।

“গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অর্ন্তভূক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা” শিরোণামে রেকর্ড সৃষ্টিকারী বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। বিশাল ঘাটতির বড় এই বাজেট অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ বাজেট বাস্তবায়নে সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। রাাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণও কঠিন হয়ে পড়বে। কর জাল বাড়ানোর ফলে জনগনের উপর করের চাপ বাড়বে। আর ঘাটতি মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বাড়বে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের শুল্ক কমানোর প্রস্তাব সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিবে। বিলাসী পণ্যে শুল্ক আরোপ করায় কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

গতকাল বৃস্পতপতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। স্পীকার হাফিজ আহমেদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। সংসদের অতিথি গ্যালারীতে তিনবাহিনীর প্রধানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। তারমধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ২লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। “গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অর্ন্তভূক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা” Ñএই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত এই বাজেটে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ের কঠোর তাগিদ রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি এবং ব্যবসা সহজীকরণের (ডি-রেগুলেশন) এক ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে মন্ত্রিসভা এই বাজেট প্রস্তাব অনুমোদন করে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্মতির পর বিকেল ৩টায় অর্থমন্ত্রী সংসদে তাঁর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন। বক্তব্যের পরে শুল্ক ও কর সংক্রান্ত আইনসমূহ সংশোধনের জন্য অর্থ বিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রায় এটি দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই বিশাল ব্যয়ের সংস্থান এবং ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভর করছে।

রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও কর জালের বিস্তৃতি: এবারের বাজেটের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ হলো ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। রাজস্বের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের জাল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করার কৌশল নিয়েছে সরকার। কর জাল বিস্তৃতির সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে এখন থেকে টিআইএন সার্টিফিকেট বা কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের করভীতি দূর করতে এবং কমপ্লায়েন্স বাড়াতে বছরজুড়ে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। বছরের শুরুতেই রিটার্ন দিলে মিলবে বিশেষ কর রেয়াত, আর সময়সীমা পার হলে ৫,০০০ টাকা বা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতা বা রিটেইলারদের ওপর একটি নির্দিষ্ট অগ্রিম কর আরোপের পরিকল্পনাও এর অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিপর্যায়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি:উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। একই সাথে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত সীমার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপও দেওয়া হয়েছে। নারী, প্রবীণ (৬৫ বছরের ঊর্ধ্ব), তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য এই করমুক্ত সীমা আরও বেশি প্রসারিত করা হয়েছে।

আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট সংস্কার : শিল্পের কাঁচামাল ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ওপর শুল্ক কমানো হলেও বিলাসবহুল পণ্যে কর বাড়ানো হয়েছে। শুল্ক কমানোর কারণে দাম কমতে পারে, ক্যানসার ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, হৃদরোগের স্টেন্ট ও রিং, ডায়ালিসিস সামগ্রী, ল্যাপটপ কম্পিউটার, সিসিটিভি ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর এবং ওয়াশিং মেশিন। এছাড়া স্বর্ণের ওপর ভ্যাট ৫% থেকে কমিয়ে ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট ২,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তামাক ও সিগারেট, বাংলাদেশে উৎপাদিত সব ধরনের অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং ১২০০ থেকে ১৬०० সিসির যাত্রীবাহী গাড়িতে কর বাড়ানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপি’র ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়।

প্রস্তাবিত ব্যয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপি’র ১৩.৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লক্ষ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট ৩ লক্ষ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৬ লক্ষ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। ক্রমান্বয়ে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ২২ হাজার ৫শত কোটি টাকা ব্যয় অর্ন্তভূক্ত রয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লক্ষ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লক্ষ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬ শতাংশ। সামাজিক খাতের এই বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিফলন।

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ও অর্থায়ন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৩.৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংস্থান করার জন্য প্রস্তাব পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লক্ষ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপক হারে ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপি’র ২.৯ শতাংশ; পক্ষান্তরে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপি’র ৪.০৫ শতাংশ হয়েেেছ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়ন করছি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত হবে, অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং এর বহুমুখী প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অধিকতর গতিশীল হবে।

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ

২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেটে সরকারের ১০ অগ্রাধিকার

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১০টি অগ্রাধিকার খাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

সবার জন্য উন্নয়ন: সব মানুষ, শ্রেণি, খাত ও অঞ্চলের ন্যায্য অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সরকারের মূল লক্ষ্য।

সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা : মৌলিক অধিকার হিসেবে একটি মূল্যবোধভিত্তিক, দক্ষতানির্ভর ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে এই বাজেটে। পাশাপাশি সবার জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা: সব বয়স ও শ্রেণির মানুষদের জন্য একটি সর্বজনীন ও জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে চায় সরকার।

বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া এবং কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করা এই খাতের লক্ষ্য। একই সঙ্গে কৃষি খাতকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার একটি কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে একটি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই প্রস্তাবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ : নিয়মনীতি বা আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অযথা বিলম্ব দূর করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন : একটি ভবিষ্যৎমুখী, গতিশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা এই বাজেটের একটি অন্যতম অগ্রাধিকার।

জীবন, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, সরকারি উদ্যোগে বনায়ন বৃদ্ধি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত ছাড়পত্রের নীতি বজায় রাখা, নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনা ও খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা: সর্বশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে, সরকারি বিনিয়োগের বাস্তবায়নকে দক্ষ ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একটি মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে টেকসই জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা হবে।

খাতওয়ারী বরাদ্দ

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ খাত: এবারের বাজেটে মানবসম্পদ ও সমাজ গঠনে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এই খাতের অধীনে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, যার পরিমাণ ৫৭,৩০১ কোটি টাকা। দেশের নাগরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দেওয়া হয়েছে ৪৯,৩৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৪৬,৭৩৭ কোটি টাকা, প্রযুক্তিগত ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ১৮,৪৫৭ কোটি টাকা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৮,১১৫ কোটি টাকা এবং চিকিৎসকদের মানোন্নয়ন ও পরিবার পরিকল্পনার জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১৩,৪৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাত: দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে অবকাঠামো খাতকে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। এই খাতের অধীনে সড়ক, রেল ও সেতু বিভাগসহ সামগ্রিক যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে মোট ৬২,৮৭২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার পরিমাণ ৩৬,৯১৭ কোটি টাকা। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে রেলপথ মন্ত্রণালয় ৯,৯৪১ কোটি টাকা, বড় বড় সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণে সেতু বিভাগ ২,৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী বিভাগকে ১৭,৩৪৫ কোটি টাকা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ১০,৫৩৩ কোটি টাকা ও আবাসন ও নগরায়ণ খাতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৫,০৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও সাধারণ প্রশাসন খাত: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কাজে ধারাবাহিক স্থায়িত্ব ধরে রাখতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে ৪২,২৯১ কোটি টাকা। দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ) পাচ্ছে ৩১,০৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি সেবা ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪,৯৪৭ কোটি টাকা, ন্যায়বিচার ও বিচার বিভাগীয় অবকাঠামো উন্নয়নে আইন ও বিচার বিভাগ ২,১২৮ কোটি টাকা এবং বিশ্বমঞ্চে ডিপ্লোমেসি সম্পর্ক বজায় রাখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১,৮৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ খাত: তৃণমূলের উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই খাতে বরাদ্দ সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে স্থানীয় সরকার বিভাগ পাচ্ছে ৪০,২৪৭ কোটি টাকা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ৩০,৪৪৩ কোটি টাকা এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে ২৮,৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ১০,৩৪৯ কোটি টাকা, নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ৮৯৩৯ কোটি টাকা, প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২৭২৭ কোটি টাকা, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২,২৪০ কোটি টাকা এবং ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র শিল্পের পুনরুজ্জীবনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ৫১২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।

বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক: মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের বাইরেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সুরক্ষায় বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য মোট ১৪ হাজার ৫ শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।