বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যাপারে প্রত্যাশা আর বাস্তবতা কখনোই সেভাবে মেলেনি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী শাসনের পতন এবং সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর দেশবাসী আশা করেছিল যে, জাতীয় সংসদই হবে রাজনীতির প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সে আশা বরাবরই অপূর্ণ থেকে গেছে। সরকারগুলো প্রায়ই জবাবদিহিতাকে উপেক্ষা করেছে, আর বিরোধী দলগুলো কার্যকর রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তে অবরোধ, বয়কট ও প্রতিবন্ধকতার পথ বেছে নিয়েছে। এ দীর্ঘ ও হতাশাজনক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বর্তমান ১৩তম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বা শপথ-সংক্রান্ত বিতর্ক কিংবা সংসদের ভেতরে ও বাইরে দলটির গঠনমূলক রাজনৈতিক অবস্থানকে নিছক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো বিরোধীদলীয় রাজনীতির এক ভিন্ন মডেলের ইঙ্গিত দেয়। আর জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পেরেছে কেননা ঐতিহাসিকভাবেই দলটির দীর্ঘ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। যদি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে তাহলে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর এ ব্যতিক্রমধর্মী কার্যক্রম ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও পরিণত ও টেকসই হতে সাহায্য করবে।
গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার দীর্ঘ ইতিহাস : যারা জামায়াতকে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করেন এবং জামায়াতের কার্যক্রমের সাথে যারা পরিচিত তারা নিশ্চয়ই অনুধাবন করবেন যে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা দলটির জন্য সার্বিক বিবেচনায় কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক রাজনৈতিক চর্চারই অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিয়েছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান প্রক্রিয়া হিসেবে অন্য যে কোনো পন্থার পরিবর্তে দলটি বরাবরই ব্যালটকেই বেছে নিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও জামায়াত ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিকূল সময়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও জামায়াতের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। এমন সময়ও এসেছে, যখন রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা ছিল ভীষণই ঝুঁকিপূর্ণ। সে সময়েও জামায়াত সক্রিয় থেকেছে, শান্তিপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এ ইতিহাসগুলো সামনে আনা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এতে প্রমাণিত হয় যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেওয়া কিংবা সংসদে সরকারের বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও দলটির সংসদে উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল নয়; বরং গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি জামায়াতের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
ইতিপূর্বে জামায়াত যখন সরকারে ছিল কিংবা সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল তখনও জামায়াতের ক্ষেত্রে এ ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত সততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দলের মতো দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে তাদের কোনো নেতার নাম জড়ায়নি। দলটির সামগ্রিক রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে অনেকেরই ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা ও দক্ষতায় জামায়াত নেতৃবৃন্দের এই সুনাম দীর্ঘদিন ধরেই সবর্জনস্বীকৃত। পুরনো এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৩তম জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান ভূমিকার মূল্যায়ন করা সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
সংস্কারের দীর্ঘ প্রতীক্ষায় একটি সংসদ : জামায়াতের সাম্প্রতিক ভূমিকা কেন ব্যতিক্রমী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির প্রচলিত চিত্রটি স্মরণ করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ সংসদীয় ব্যবস্থায় স্বাভাবিক প্রত্যাশা হলো যে, সরকার সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, আর বিরোধী দলও সাংবিধানিক মর্যাদা বজায় রেখে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখবে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনোই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকারগুলো বারবার এমন আচরণ করেছে যেন তারা ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোও অনেক সময় কেবল বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করেছে।
অতীতে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, নির্বাচিত বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ক্ষোভের বশে শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধী দলগুলো ওয়াকআউট করেছে এবং মাসের পর মাস সংসদ বয়কট করেছে। অনেকক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, কেবল সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার উপক্রম হলেই তারা পুনরায় অধিবেশনে যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারও এসব অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কার্যত একতরফাভাবে সংসদ পরিচালনা করেছে। বিরোধী দলকে সংসদে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আন্তরিক আগ্রহ খুব কমই দেখা গেছে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক চক্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ।
যৌক্তিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া : এ প্রেক্ষাপটে ১৩তম জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী বলে প্রতীয়মান হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে দলটির কাছে যথেষ্ট পরিামণ যৌক্তিক ও তথ্যভিত্তিক প্রমাণ ছিল। তবুও তারা সরাসরি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার পথ বেছে নেয়নি। বরং ফলাফল মেনে নিয়ে পরবর্তী সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এটি ছিল একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা দেশকে বড়ো ধরনের অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করেছে। জামায়াত চাইলে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারত এবং সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারত। কিন্তু দলটি সে পথ অনুসরণ করেনি।
অমীমাংসিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংসদে অংশগ্রহণ : এবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ গ্রহণের কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কারণ নির্বাচন এবং গণভোট একই আইনি আদেশের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জামায়াত ও এনসিপি সদস্যরা দুটো শপথ নিলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি দ্বিতীয় শপথ তথা সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সংসদে এসেই বিএনপির এমন একটি সিদ্ধান্ত জামায়াতসহ সকল বিরোধীদলীয় সদস্যদের জন্য ছিল বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। এরপরও জামায়াতে ইসলামী সংসদ বর্জনের পথ বেছে নেয়নি। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে তারা সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখে। অতীতে তুলনামূলক অনেক ছোট ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো মাসের পর মাস সংসদ বর্জন করেছে। জামায়াত সেই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসে। জনগণের দেওয়া গণরায় এবং জুলাই জাতীয় সনদের চেতনাকে সম্মান জানিয়ে দলটি সংসদে যোগ দেয়। সেখানে তারা গণভোটের বাস্তবায়নের দাবি উত্থাপন করে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়, যাতে অর্থবহ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।
প্রতিবন্ধকতা নয়; গঠনমূলক বিরোধিতা : সরকার বিরোধী দলগুলোর ন্যায্য দাবি দাওয়ার প্রতি ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ার পরও জামায়াতে ইসলামী প্রতিবন্ধকতার রাজনীতিতে ফিরে যায়নি। বরং তারা গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকাই পালন করে গেছে। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এমন ধরনের বিরোধী দলের সঙ্গে পরিচিত, যারা সংসদে প্রবেশ করেই হট্টগোল, বিক্ষোভ ও ওয়াকআউটের মাধ্যমে অধিবেশনকে অচল করে দেয় অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য সংসদ বর্জন করে। জামায়াতের পদ্ধতিটি কার্যত ভিন্ন। দলটি সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে, তবে সেই সমালোচনা প্রতিক্রিয়াশীল বা উদ্দেশ্যহীন ছিল না। বরং সরকারের ভুলগুলো সংশোধনে সহায়তা করার লক্ষ্যেই তারা সমালোচনা করেছে, কেবলমাত্র রাজনৈতিকভাবে সরকারকে বিব্রত করা তাদের উদ্দেশ্যে ছিল না।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাতীয় সংসদসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও একটি আশাব্যঞ্জক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গেছে। নির্বাচনের পর প্রথম রমজানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা জনাব তারেক রহমান বিরোধী দলের আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। একইভাবে বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এমন দৃশ্য প্রায় অকল্পনীয় ছিল। এর আগে সেনা দিবস ছাড়া দু নেত্রীর মুখোমুখি হওয়ার নজির ছিল না। দু নেত্রী এ একটি প্রোগ্রামে যাবেন এবং পাশাপাশি বসবেন- এমন ছবি তোলার জন্য বছরজুড়ে সাংবাদিকেরা অপেক্ষা করতেন। এবার সেই চিত্রের ভিন্নতা ছিল শুরু থেকেই। বিরোধী দলগুলো একদিকে যেমন সরকারের ইতিবাচক নীতির প্রশংসা করেছে, আবার একইসাথে ব্যর্থতা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ চর্চায় ঠিক এভাবেই সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক এমনটাই হওয়ার কথা। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে অথবা প্রতিহিংসার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে। এমন পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিও এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে পরিবর্তনের যে আভাসগুলো এখন দৃশ্যমান, তা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক।
সংসদের বাইরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন : জামায়াতের ভূমিকা এখন কেবল সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকার যখন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে অনীহা, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পাস করতে অস্বীকৃতি এবং স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও বৈষম্যমূলক চর্চা অব্যাহত রাখার প্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী সংসদের বাইরেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ধারাবাহিকভাবে জনসভা ও সমাবেশ আয়োজন করছে নিয়মিতই। এখানেও লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিরোধী দলের এই আন্দোলন কর্মসূচিগুলো একদমই অহিংস ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিরোধী দলের এই রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোও বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভিন্ন বলেই প্রতীয়মাণ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, কিন্তু একই সঙ্গে সহিংসতা এড়িয়ে চলার এ কৌশল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
জামায়াতের ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ : এ সংসদটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ। ফলে এখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের আচরণই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদি এ সংসদ কার্যকর থাকে এবং উভয়পক্ষ তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর জন্য পুনরায় রাজনৈতিক পরিসর দখল করা বা রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, যারা নানা ধরনের কৌশলের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের জুলুম ও অনাচারকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তাদের হাতেও তখন খুব বেশি সুযোগ থাকবে না। কিন্তু যদি সংসদ আবার অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সংলাপ ভেঙে যায়, তাহলে সরকার বা বিরোধী দল কেউই লাভবান হবে না; বরং দেশের জনগণকেই এজন্য আবার মাশুল গুণতে হবে।
রাজনৈতিকভাবে যেটুকু ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা ধরে রাখতে হলে কয়েকটি কাজ করা জরুরি। প্রথমত, সব ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে সিনিয়র সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের এ ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর ফাঁদে পড়া যাবে না। সব মিলিয়ে পুরো সংসদে হাতেগোনা কয়েকজন আছেন-যারা এসব উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। তাদের সংকট হলো, তারা মান্ধাতা আমলের রাজনৈতিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। সময়ের পালস বুঝতে পারছেন না। এ কয়েকজনকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই সংসদের সামগ্রিক পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে। দ্বিতীয়ত সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা এখনও পর্যন্ত নিজেদের জায়গা থেকে যে ঔদার্যতা লালন করছেন তা অন্য সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তৃতীয়ত, এমন কোনো কাজ করা যাবে না, কথা বলা যাবে না যাতে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের দোসরেরা সুবিধা পেয়ে যায়। তাদেরকে এক ইঞ্চিও ছাড় দেয়া যাবে না। আর সর্বশেষ দু দলেরই সচেতনভাবে অতীত ইতিহাসের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। কারণ নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে সব দলের ইতিহাসেই ভুল পাওয়া যাবে। আর ভুল ছিল বলেই বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দল বিগত দেড় দশক যথেষ্ট মাত্রায় ভোগান্তিও সহ্য করেছে। নতুন করে সেই ভুল নিয়ে চর্চা না করে বরং একটি ফরওয়ার্ড লুকিং রাজনীতি যদি করা যায় তাহলে অপশক্তির ফিরে আসা যেমন বন্ধ হবে তেমনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতও অনেক বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে।