ছোটোবেলায় দেখেছি, খারাপ ছাত্রদের শিক্ষকরা বলতেনÑতোদের আবার ‘বাল্যশিক্ষা’ থেকে শুরু করতে হবে। বাল্যশিক্ষার গুরুত্ব এখনো আছে। প্রাথমিক পাঠটাই যদি শেখা না হয়, তাহলে পৃথিবীটা তো প্রাণীতে ভরে যাবে। এখনো কিছু মানুষের দেখা মিলে। দিনে দিনে তা আরো কমে যাবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এ যুগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই, গড়ে উঠছে নিত্যনতুন কলকারখানাও। তারপরও গড়ে উঠছে না মানুষ; বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে অভাব-অনটনও। সম্পদ কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। এমন চিত্র দেশের এবং বিদেশেরও। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে অর্থনীতি চলছে, তা সুষম নয়, ন্যায়সঙ্গতও নয়। ফলে বন্টনের সঙ্কট বেড়েই চলেছে। এ সবের খবর বিশ্ব নেতারা জানেন, জানেন ছোট নেতারাও। কিন্তু সংকটের কোনো সমাধান নেই। কারণ, জানাটাই সমাধান নয়। সমাধানের জন্য মানবিক হৃদয় প্রয়োজন, প্রয়োজন নীতিবোধ। এ জিনিসের বড়ই অভাব বর্তমান সভ্যতায়। এ সভ্যতায় তো পারসূট (Pursuit) অব ম্যাটেরিয়ালিজম চলছে। সবাই এখানে ভনভন করে টাকার পেছনে পাগলের মত ছুটছে। এসব পাগলদের সুুস্থ করতে, মানুষ করতে এখন ‘বাল্যশিক্ষা’ প্রয়োজন, প্রয়োজন অনেক কিছুরই পুনঃপাঠ। মানুষ হওয়ার সংকট শুধু পাশ্চাত্যে নয়, প্রাচ্যেও এ সংকট বিরাজ করছে। আমাদের অঞ্চলটার অবস্থাই বা কেমন? সার্ক তো (SARC) হলো না, তাই বলে হিংসা ও বিদ্বেষের বাঁশি বাজাতে হবে কেন? এই অঞ্চলের বড় দেশ ভারতের কারণে সার্ক ডানা মেলতে পারলো না। দিন দিন দেশটির দাদাগিরির প্রবণতা এতটাই বেড়ে গেল যে, প্রতিবেশি কোনো দেশই তাকে আর বন্ধু ভাবে না। এখন যা চলছে, তা শুধুই কূটনীতি কিংবা ছলাকলা।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অমসম্মান হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়েছে। ছাত্র-জনতা এবং রাজনীতিবিদরা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার শপথ নিয়েছে, দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের আকাংখার নতুন রাজনীতি পছন্দ হয়নি ভারতের। পলাতক হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে গিয়ে তারা জনগণের ম্যাণ্ডেটপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ক একেবারে শীতল করে ফেলে। এখানে বিশদ বর্ণনার সুযোগ নেই। এরপর বাংলাদেশে নির্বাচন হলো। বিএনপি সরকার গঠন করলো, বিরোধী দলের মর্যাদা পেল জামায়াতে ইসলামী। নতুন সরকার গঠনের পর ভারত ইতিবাচক কথা বললো। বিএনপি সরকারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের আকাংখা ব্যক্ত করলো। বিএনপি সরকারও তাতে সাড়া দিল। কিন্তু ভারত যা বলে তা করে না। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর অনেক উগ্রবয়ান লক্ষ্য করা গেল। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আবার বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার মত ঘৃণ্য আস্ফালনও করা হলো। আবারও প্রমাণিত হলো, ভারত প্রতিবেশি দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে জানে না। সাথে যুক্ত করা হয়েছে পুশব্যাকের চাপ। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী।

বন্ধুত্বের নতুন কোনো বার্তা দিতে সক্ষম হননি ভারতের নতুন হাকিমিশনার বরং বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন দিনেশ ত্রিবেদী। গত শুক্রবার (১২ জুন) বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রদূত যখন কোনো স্বাধীন দেশে পা রাখেন, তখন তার প্রথম বক্তব্যেই সেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন বাধ্যতামূলক বিষয়। দিনেশ ত্রিবেদী তেমন কর্তব্য পালনে সমর্থ হননি। বরং তার বক্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। শুক্রবার বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘দুইদেশ মিলে যে শক্তি হবে ওইটা আসল শক্তি। ওই শক্তিটা যেন পুরো পৃথিবী দেখে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা, আর বাংলাদেশের ২০ কোটি যদি এক সঙ্গে করা হয়, তাহলে ১৬০ কোটি। দুই গণতান্ত্রিক দেশের শক্তি এক হলে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তা বৃহৎ একটি জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। তার এই ‘দুইদেশ এক হওয়া’ এবং জনসংখ্যা বেড়ে ‘১৬০ কোটি বানানোর’ বক্তব্যকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অস্তিত্বের প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ আঘাত ও উস্কানি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশর মানুষ। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে এমননিতেই এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে সীমান্তে বিএসএফ-এর নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যা এবং জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করার নোংরা রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন সময় নতুন হাইকমিশনারের অদূরদর্শী মন্তব্য জ¦লন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ভারতের জনসংখ্যা আর বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে এক করার কথা যারা বলেন, তাদের বলতে চাই- সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট জনগোষ্ঠী ২২০ কোটির বেশি। যারা সার্কের ঐক্য চায় না, তারা শুধু দুই দেশের ঐক্যের কথা বললে আমরা সন্দেহের চোখে দেখবো। এমন বিশ্লেষণের কোনো জবাব আছে কি ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে?

‘চানক্যনীতি’ ও ‘মাৎস্যন্যায়’ ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসবের চর্চায় ভারত সরকার খুবই উৎসাহী। নরেন্দ্র মোদির আমলে তা যেন ষোলকলায় পূর্ণ হতে চলেছে। তবে মানবজাতি অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করেছে যে, চাতুর্য ও আগ্রাসনের ফলাফল আখেরে ভালো হয় না। চাতুর্য ও মাৎস্যন্যায় দিয়ে ভারত আসলে কি কিছু অর্জন করতে পেরেছে? চাতুর্য ও আগ্রাসন নীতির কারণে প্রতিবেশীরা ভারতের ওপর বিরক্ত। সমীহ করার বদলে প্রতিবেশী দেশগুলো এখন ভারত সরকারকে ঘৃণা করে। দাদাগিরি দিয়ে তো আস্থা অর্জন করা যায় না। বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকারকে নিয়ে তো মোদি সরকার বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল, সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কথাও বলেছিল। কিন্তু এতসব বয়ানের পরও ভারতের আচরণের কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে? না, চানক্য ও মাৎস্যন্যায়ের নীতিতেই তারা বন্দী হয়ে আছেন। সেখানে কোনো সুবাতাস নেই, নেই কোনো মহত্ব। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সাথে ভারত কেমন আচরণ করলো? তাঁকে দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হেনস্তা এবং দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। উল্লেখ্য, জাহেদ উর রহমান কোনো প্রমোদভ্রমণে ভারত যাননি। দিল্লিতে সোমবার শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল তাঁর। কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও গত রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দেয় এবং হেনস্তা করে। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তাঁর সফর বাতিল করে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এমন অন্যায় ও অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন কুমার বাধেকে তলব করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই ঘটনায় বাংলাদেশের তীব্র অসন্তোষ এবং গভীর হতাশার কথা জানানো হয়। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ঘটনাটিকে অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভারতের আচরণে বাংলাদেশ তো তীব্র অসন্তোষ ও গভীর হতাশার কথা জানালো, কিন্তু এমন বার্তায় দিল্লির আচরণে কোনো পরিবর্তন ঘটবে কী? পরিবর্তনের জন্য তো মানবিক মন প্রয়োজন, নীতিনিষ্ঠ চেতনা প্রয়োজন। ভারতের ক্ষমতার কাঠামোতে এ বিষয়গুলো এখন অনুপস্থিত। বরং সরকারের উৎসাহে এখন ভারতে হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি প্রবল। এর প্রভাব পড়েছে ভারতের সমাজে এবং জনমনে। ১৪ জুন ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় আকবর মন্ডল (৪৭) নামে এক দরিদ্র মুসলিম ফেরিওয়ালাকে কুড়াল দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় তীব্র মুসলিমবিদ্বেষী ও ভীতিমূলকত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এমন কি মুখে দাড়ি থাকার কারণে প্রায়শই মুসলিম ফেরিওয়ালাদের জোরপূর্বক ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হয়। তারা বলে, এখানে আমাদের ফেরি করতে দেয়া হবে না। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে থাকি। একজন দরিদ্র ফেরিওয়ালাকে শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্যটা কেমন? এমন দৃশ্যকেতো ভারতের সংবিধান সমর্থন করে না, সমর্থন করে না হিন্দুধর্মও। সংবিধান ও ধর্মবিরোধী এই শক্তির পরিচয় কী? এই অপশক্তির শীর্ষ ব্যক্তিরাই তো এখন ভারত শাসন করছে। আমরা ওদের চানক্য ও মাৎস্যন্যায়ের ভ্রান্ত পথে যাবো না। আমরা ন্যায় ও মানবিক মহত্বের পথে এগিয়ে যাব। কারণ, মন্দ দূরীকরণে প্রয়োজন উত্তমের উদ্বোধন।