ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জমকালো মঞ্চের পর্দা নামতে আর মাত্র দুটি ম্যাচ বাকি। তবে ফুটবল দুনিয়ার সমস্ত আলো যখন অর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল ম্যাচের দিকে, ঠিক তার আগেই এক অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু মর্যাদার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। আজ শনিবার ফ্লোরিডার মায়ামির ঐতিহ্যবাহী হার্ড রক স্টেডিয়ামে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় ১৯ জুলাই, রোববার ভোর ৩ টায় শুরু হবে। সেমিফাইনালে চরম নাটকীয়তার পর শিরোপা স্বপ্ন ভাঙার বেদনা ভুলে, অন্তত ব্রোঞ্জ পদক বুকে জড়িয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করার লক্ষ্য এখন দুই শিবিরের। এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ফ্রান্স সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে দীর্ঘ সময় এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের ঝড়ে ২-১ ব্যবধানে স্বপ্নভঙ্গ হয় ১৯৬৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংলিশরা স্বপ্ন দেখলেও এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোল তাদের ফাইনালে ওঠার পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলে দুই দলের সামনেই এখন সান্ত্বনার পুরস্কার হিসেবে তৃতীয় স্থান নিয়ে মাঠ ছাড়ার চ্যালেঞ্জ।
তবে ফাইনালের টিকিট হাতছাড়া হওয়ার পর এই ম্যাচটি নিয়ে দুই শিবিরের মানসিক অবস্থা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ফুটবলারদের মনে সেমিফাইনালের ক্ষত এখনো দগদগে। ম্যাচটি নিয়ে নিজের স্পষ্ট ও অকপটে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ থমাস টুখেল। ম্যাচ-পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত হতাশাজনক কণ্ঠে তিনি বলেন যে, আমাদের কোনো খেলোয়াড়ই এই ম্যাচ খেলতে চায়নি, ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরাও নয়। সবাই আসলে ফাইনালে খেলতে চেয়েছিল এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা মাঠে আমাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন আমাদের এই ম্যাচটি খেলতে হবে। ফ্রান্সের তুলনায় আমরা একদিন কম বিশ্রাম পেয়েছি, তবুও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে আমরা মাঠে আমাদের সেরাটাই দেব। হতাশার মাঝেও দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে টুখেল যোগ করেন যে, আরেকটি বিশ্বকাপের জন্য আমাদের চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্বের অনেক বড় বড় দল আগেই বিদায় নিয়েছে, সেই তুলনায় সেমিফাইনালে পৌঁছানো অবশ্যই বড় সাফল্য। যদিও এই মুহূর্তে কেউ সেটা শুনতে চাইবে না, কারণ আমরা নিজেদের কাছ থেকে আরও বেশি আশা করেছিলাম।
ইংলিশ শিবিরের এই হতাশার বিপরীতে ফরাসি শিবিরে ম্যাচটি ঘিরে জড়িয়ে আছে এক বিশাল আবেগের অধ্যায়। এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ দিদিয়ের দেশঁমের শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘ ১৪ বছরের গৌরবময় পথচলার ইতি টানতে যাচ্ছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে তার অধীনে ফ্রান্স ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০২২ সালে রানার্সআপ হয়েছে এবং এবারও শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে। এই কিংবদন্তি কোচের বিদায়বেলাকে একটি জয় উপহার দিয়ে স্মরণীয় করে রাখতে মরিয়া ফরাসি ফুটবলাররা। বিদায়ের আগে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে কোচ দিদিয়ের দেশঁম বলেন যে ফাইনালে না উঠতে পারার একটা বিশাল হতাশা তো আমাদের ভেতর আছেই, কিন্তু এই ম্যাচটি আমাদের জন্য সম্মান রক্ষার। দীর্ঘ ১৪ বছর পর এই দলের ডাগআউটে এটিই আমার শেষ ম্যাচ। আমি চাই ছেলেরা শেষবারের মতো মাঠে নিজেদের সেরাটা দিক এবং আমরা অন্তত একটি জয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনের গৌরব নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করি। এই সুযোগটি আমরা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাই না।
দলগত লড়াইয়ের পাশাপাশি এই ম্যাচটি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা গোল্ডেন বুট জয়ের ভাগ্য নির্ধারণের এক রোমাঞ্চকর মঞ্চে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করেন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের খুব একটা গুরুত্ব নেই, কিন্তু ব্যক্তিগত পুরস্কারের ক্ষেত্রে এই ম্যাচের গোল টুর্নামেন্টের মোট গোলসংখ্যার সাথে যুক্ত হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে টমাস মুলার ও ডেভর সুকরের মতো সাতজন তারকা এই ম্যাচেই গোল করে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেছিলেন। এবার সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। চলতি আসরে ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে তিনি আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সাথে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন। তবে একটি অ্যাসিস্ট বেশি থাকায় মেসি আপাতত এগিয়ে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে একটি গোল করতে পারলেই এমবাপ্পে এককভাবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে যাবেন, পাশাপাশি বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে নিজের মোট গোলসংখ্যাকে ২০-এ নিয়ে গিয়ে সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নতুন ইতিহাস গড়বেন। এমবাপ্পে নিজের লক্ষ্য নিয়ে বলেন যে দলকে ফাইনালে তুলতে না পারা অধিনায়ক হিসেবে আমার বড় ব্যর্থতা। তবে আমাদের বিশ্বকাপ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। গোল্ডেন বুট জেতা বা ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়ার একটা চমৎকার সুযোগ আমার সামনে আছে, তবে আমার প্রধান লক্ষ্য থাকবে কোচ দেশঁমকে একটি জয় দিয়ে বিদায় জানানো।
অন্যদিকে, গোল্ডেন বুটের এই লড়াইয়ে এখনো টিকে আছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং তারকা মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম। দুজনের ঝুলিতেই রয়েছে ৬টি করে গোল। এই ম্যাচে বড় কোনো চমক দেখাতে পারলে বা হ্যাটট্রিক করতে পারলে তারাও গোল্ডেন বুটের ট্রফি নিজেদের করে নিতে পারেন। বিশেষ করে ৩৩ বছরে পা রাখতে যাওয়া ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জন্য এটিই ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেইন নিজের ভাবনা প্রকাশ করে বলেন যে, ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন পূরণ না হওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত ট্র্যাজিক ছিল। তবে দেশের জার্সি গায়ে প্রতিটি ম্যাচই সম্মানের। এটি সম্ভবত আমার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হতে যাচ্ছে, তাই আমি ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের জয় নিশ্চিত করে একটি ইতিবাচক সমাপ্তি টানতে চাই।