৯৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে পেরিয়ে এসেছে ২২টি রোমাঞ্চকর আসর। বিশ্বমঞ্চে হাজারো ফুটবলার পা রাখলেও কতজন পেরেছেন নিজেদের অনন্য কীর্তিতে ইতিহাস রাঙাতে? মেসি, ম্যারাডোনা, পেলে নাকি অন্য কেউÑবিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা কে? চিরন্তন বিতর্কের মাঝে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০ কিংবদন্তিকে বেছে নিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি স্পোর্টস’।
এই ১০ ফুটবলারকে নিয়ে তৈরি করা তালিকাটি নিচে দেয়া হলো:
১. পেলে (ব্রাজিল): এই তালিকায় অবধারিতভাবেই সবার শীর্ষে আছেন ফুটবলের কালো মানিক পেলে। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০) জয়ের রেকর্ড রয়েছে তার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়া পেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ কিংবদন্তি হিসেবে।
২. দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা): তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছেন ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় ছিল মূলত ম্যারাডোনার একক রূপকথার গল্প। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং এর ঠিক পরেই ৫ ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ তাকে ফুটবল বিশ্বে অমর করে রেখেছে।
৩. রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল): ইনজুরির সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘ফেনোমেনন’ রোনালদোর ফিরে আসার গল্পটা ছিল রূপকথার মতো। ১৯৯৮ সালের ফাইনালের ট্র্যাজেডি ভুলে ২০০২ আসরে একাই ৮ গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম ও শেষবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন ‘আর-নাইন’।
৪. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): আধুনিক ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি আছেন তালিকার চতুর্থ স্থানে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নিজের একক কাঁধে টেনে শিরোপা এনে দেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি অসাধারণ নেতৃত্ব তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
৫. ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার (জার্মানি): পঞ্চম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন পশ্চিম জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ফুটবল ইতিহাসে ‘ডের কাইজার’ খ্যাত এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৭৪ সালে এবং পরবর্তীতে ডাগআউটে কোচ হিসেবে ১৯৯০ সালে জার্মানিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার বিরল গৌরব অর্জন করেন।
৬. কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স): তালিকার ষষ্ঠ স্থানে আছেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পোস্টার বয় কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে শিরোপা জেতেন তিনি। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বমঞ্চে নিজের বিধ্বংসী রূপ আরও একবার প্রমাণ করেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
৭. জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স): ফরাসি জাদুকর জিনেদিন জিদান আছেন তালিকার সপ্তম স্থানে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ফ্রান্সকে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার জোড়া হেডের গোল ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তবে ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির মাতেরাজ্জিকে ঢুস (হেডবাট) মেরে লাল কার্ড দেখার বিতর্কও তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
৮. পাওলো রসি (ইতালি): ১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালির পাওলো রসির প্রত্যাবর্তন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নাটকীয় অধ্যায়। ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির কারণে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলে ফিরেই তিনি অবিশ্বাস্য পারফর্ম করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ টুর্নামেন্টে ৬ গোল করে ইতালিকে শিরোপা জেতান এবং একই সাথে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল নিজের করে নেন।
৯. কাফু (ব্রাজিল): ব্রাজিলের কিংবদন্তি রাইট-ব্যাক কাফু আছেন নবম স্থানে। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল (১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২) খেলার অনন্য কীর্তি রয়েছে তার। যার মধ্যে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন এবং ২০০২ বিশ্বকাপে সেলেসাওদের অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
১০. জিওফ হার্স্ট (ইংল্যান্ড): তালিকার দশম স্থানে আছেন ইংলিশ ফুটবলার জিওফ হার্স্ট। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে তার অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিক ইংল্যান্ডকে তাদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিয়েছিল। ঘরের মাঠের সেই ঐতিহাসিক জয় আজও ইংলিশ ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।