বিমান দুর্ঘটনার স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন

সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি

স্টাফ রিপোর্টার

বিভীষিকাময় সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে মাইলস্টোনের খুদে শিক্ষার্থীদের। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ প্রাণ হারিয়েছিলেন মোট ৩৬ জন। যাদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল খুদে শিক্ষার্থী। ভয়াবহ দুর্ঘটনার গভীর ক্ষতচিহ্ন এখনো বহন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটির ‘হায়দার আলী ভবন’। ভবনটির দিকে তাকালেই নিমিষে ভেসে ওঠে সেই দিনের স্মৃতি, ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। এদিকে, মাইলস্টোন দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটির যথাযথ অনুমোদন ছিল না। এমনকি দোতলা ভবনটি ভেঙে ফেলার অঙ্গীকারও রাজউকের কাছে করেছিল কর্তৃপক্ষ।

তবে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনার পরও মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ নতুন একটি সাততলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি চলছে আরও একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই নির্মাণকাজ হচ্ছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী জানিয়েছেন, এই ভবনের নকশা দুই বছর আগেই অনুমোদন হয়েছে। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই কাজ চলছে। এখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে না-এমন কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর খান বলেন, এখানে ভবন হবে কি হবে না, সেটি অবান্তর প্রশ্ন। এটি বেবিচকের অনুমোদিত আবাসিক এলাকা। আশপাশে ১১-১২ তলা বহু ভবন রয়েছে। তার চাইতে আমাদের ভবনগুলো নিচু। বিমানবন্দরের আশেপাশে ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোনো ভবনের উচ্চতা কতটুকু হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। তাদের ছাড়পত্র নিয়েই পরবর্তীতে আবেদন করতে হয় রাজউকে। মাইলস্টোনের দুর্ঘটনার পর যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ পাথের নিচে নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা জনসমাগম হয়-এমন কোনো স্থাপনার অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের সব বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ সারফেস এলাকায় এ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয়। রাজউক উত্তরা অঞ্চলের অথরাইজড অফিসার এস. এম. এহসানুল ইমাম বলেন, ২০২২ সালে একটি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকবে কি থাকবে না, কিংবা বিমানবন্দর থাকবে কি থাকবে না এসব একটি বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যানের বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায়ে নিতে হয়। সরকার বা কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটিই বাস্তবায়ন হবে।

সিভিল এভিয়েশনের এটিসি সদস্য এয়ার কমডোর (অব.) মো. নূর-ই-আলম একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কোনো স্থানে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা কত হবে, সে বিষয়ে মতামত দেয়ার এখতিয়ার আমাদের রয়েছে। কিন্তু সেখানে কী ধরনের ভবন হবে বা কী কাজে ব্যবহার হবে, সে সিদ্ধান্ত আমাদের নয়। তাদের দাবি, শুধু মাইলস্টোন নয়, উত্তরা এলাকায় অন্তত শতাধিক ভবন উচ্চতার বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এয়ার কমডোর (অব.) নূর-ই-আলম বলেন, আইসিএওর অ্যানেক্স-১৪-এ সুপারিশ রয়েছে, বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি শব্দ-সংবেদনশীল বা অধিক জনসমাগম হয় এমন স্থাপনা এড়িয়ে চলা উচিত। এস. এম. এহসানুল ইমাম বলেন, শুধু মাইলস্টোন নয়, উত্তরা এলাকায় পরিদর্শনে আরও কিছু ভবন পেয়েছি, যেগুলো উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনের ৩০টি সুপারিশের অন্যতম ছিল, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নির্বিঘেœ পরিচালনার জন্য ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া। সিভিল এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ. টি. এম. নজরুল ইসলামের মতে, এত বড় দুদুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন কতৃপক্ষকে নতুন ভবন নির্মানের অনুমতি দেয়া অনুচিত। একই সঙ্গে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবিও জানান।

কী ঘটেছিল সেদিন

২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার। দুপুর প্রায় ১টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই পুরো এলাকা পরিণত হয় বিভীষিকার জনপদে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় শিশুদের কোমল শরীর। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও। সময়ের সঙ্গে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকতা কিছুটা ফিরেছে। শিক্ষার্থীরা আবার ক্লাসে ফিরেছে, চলছে নিয়মিত পাঠদান। কিন্তু ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় দুপুর আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে অনেকের মনে। মাঝে মধ্যেই আকাশে বিমানের শব্দে আঁতকে ওঠেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অনেকের চোখ ভিজে ওঠে অজান্তেই।

সন্তান হারানো পরিবারগুলোর শোকও এক বছরেও কাটেনি। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ হয়নি। ফলে বিচার ও জবাবদিহি নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুর্ঘটনায় নাফি ও নাজিয়া নামে দুই সন্তানকে হারিয়ে নিঃসন্তান হয়ে পড়া আশরাফুল বলেন, এক বছর পরও তিনি ও তার পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সন্তানদের স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। সরকারের কাছে তার একমাত্র প্রত্যাশাÍহারানো সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রথমদিকে বিভিন্ন মহল থেকে খোঁজখবর নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে তা কমে গেছে। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এমনকি দুর্ঘটনায় নিহত স্কুলকর্মী মাসুমা বেগমের পরিবারও প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি বলে দাবি করেছেন তার স্বামী।

শ্রদ্ধা নিবেদন

গত বছর ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার স্মরণে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক ভাবগম্ভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দুর্ঘটনাকবলিত সেই ভবনের সামনে নির্মিত বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই স্মরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিএনসিসি ও স্কাউটসের সদস্যরা সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ ও সালাম প্রদর্শনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শোক ও স্মৃতির এই দিনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত স্কাউট ও বিএনসিসি সদস্যরা নীরবতা পালন করেন এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন। মাইলস্টোনের একজন শিক্ষিকা বলেন, ট্রমা কাটিয়ে উঠতে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা অনেকটাই সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠেছে।

মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে শোক ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছরের ২১ জুলাই সংঘটিত মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনায় মাইলস্টোন কলেজের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাইলস্টোন কলেজের সর্বমান্য উপদেষ্টা কর্নেল নূরন নবী (অব.)। বিশেষ অতিথি ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. জিয়াউল আলম। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপাধ্যক্ষ (প্রশাসন) মো. মাসুদ আলম। এ সময় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

দোয়া মাহফিলে নিহতদের রুহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানায় মাইলস্টোন পরিবার। আয়োজকরা বলেন, এই শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং তাদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়েছে।