গ্যাস-সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে সারাদেশে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেয় জ্বালানি বিভাগ। ২০১৩ সালের শেষ দিকে কিছু সংযোগ দেয়া হয়েছিল। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর জ্বালানি বিভাগ থেকে মৌখিকভাবে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ দিতে মানা করা হয়। সেই থেকে নতুন গ্যাস সংযোগ পায়নি কোন গ্রাহক। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেরিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে।

তবে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আবাসিকের সব গ্যাস লাইনে গ্যাস সরবরাহ থেকে সরে আসতে চায় সরকার। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে এমন পরিকল্পনার বিষয় উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।

এরই মধ্যে আগামী দিনে গ্যাসের সংকট মাথায় রেখে সরকার প্রি-পেইড মিটার এবং গ্যাসলাইন নির্মাণের ১৫ হাজার কোটি টাকার ২ প্রকল্প বাতিল করে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেড় বছরের মধ্যে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবসা বড় আকারে শুরু করতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এজন্য প্রাথমিকভাবে মোংলা ও এলেঙ্গায় ২টি এলপিজি প্ল্যান্ট করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত ২২ জুন সংসদে বলেছেন, এলপিজি ‘সহজলভ্য’ হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ চালুর বিষয়ে সরকারের আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই । ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত গড় গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট

মন্ত্রী জানান, আটটি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত গ্যাস লোড অনুযায়ী দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত গড় গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি জানান।

তিতাসের একজন র্শীষ কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, আবাসিকে এখন যে সংযোগ রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে। কতদিনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চার থেকে পাঁচ বছরের কথা বলা হয়েছে। সরকার মনে করছে আবাসিকে যে ১২ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয় তা শিল্পে সরবরাহ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে গৃহস্থালির গ্যাস ব্যবহারকারীরা এলপিজি ব্যবহার করবে। পৃথিবীর কোথাও এমন পাইপলাইনের গ্যাস নেই। আমাদের এখানেও থাকবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এজন্য গৃহস্থালির গ্যাস উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাতিল করে দিয়েছে নতুন সরকার। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যে ঋণ চুক্তি সই হয়েছিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তাও বাতিল করতে বলা হয়েছে। এই খাত থেকে টাকা নিয়ে এলপিজির অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে করে এলপিজির প্রতি বোতলে ১১০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে।

আবাসিকে গ্যাস সংযোগ ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় এলো এবিষয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি বিভাগের একটি বৈঠকে এ পরিকল্পনার বিষয়টি আলোচনা হয়। এখন যারা আবাসিকে গ্যাস ব্যবহার করছেন তাদের গ্যাস সংযোগও চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কেটে দেওয়া হবে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে তিতাসের উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে পুরনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং প্রিপেইড মিটার স্থাপন নিয়ে বৈঠক হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকটির কার্যপত্রে গত ৬ মে স্বাক্ষর করেন তিনি। তবে বৈঠকের কার্যপত্রে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সংযোগ কেড়ে নেওয়ার এই পরিকল্পনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বৈঠকে আবাসিকের গ্যাস সংযোগ না থাকার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও সাত পৃষ্ঠার কার্যপত্রের পঞ্চম পৃষ্ঠার ৪.৩-এ বলা হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পসমূহে বিনিয়োগকৃত ঋণ অন্য কোনো উপযুক্ত প্রকল্পে স্থানান্তর করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে নাগরিকদের জন্য এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থা সহজীকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সেই ঋণ পুনর্বিন্যাস করার বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা, সমন্বয় এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই প্যারার ৪টি শব্দ ‘প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে’ উল্লেখ করে বিষয়টির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে পাইপলাইন স্থাপন বিষয়ে তিতাসের পরিকল্পনায়ও বাধা দেওয়া হয়। কার্যপত্রের ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত ডিপিপি অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক পাইপলাইন প্রতিস্থাপন না করে কেবল যেসব এলাকায় অবস্থিত পাইপলাইন খুব জরাজীর্ণ বা প্রতিস্থাপন করা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই, শুধু সেসব এলাকায় নির্মাণ করতে হবে।

সূত্র জানায়, প্রতিদিন যে গ্যাস ব্যবহার হয় তার ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে ব্যবহার হয়ে থাকে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৩৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হয়। বিগত অর্ন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গ্যাস সংযোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘নতুন সংযোগ কখনো আর দেওয়া হবে না। পুরনোগুলোও বন্ধ করে দেওয়া উচিত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবাসিকে সংযোগ উন্মুক্ত হতে পারে এমন ধারণা করা হলেও এখন উল্টো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যাদের আবাসিক সংযোগ রয়েছে তাদের সংযোগও থাকাটাও অনিশ্চিয়তায়।

সূত্র জানায়, সরকার বরাবর সংকটের কথা বললেও আবাসিক খাত থেকে বিতরণ কোম্পানি সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করে। একজন গ্রাহক ১২ ঘণ্টা দুটি চুলা জ্বালিয়ে রাখলে যে পরিমাণ গ্যাস পুড়বে, সেই বিল ধরেই আবাসিকের বিল হিসাব করা হয়। কিন্তু তিন বেলা রান্নায় কোনো গৃহকর্তার গড়ে ১২ ঘণ্টা ব্যয় হয় না। প্রতি বেলা রান্নায় সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা করে ব্যয় হলেও অর্ধেক গ্যাস পুড়িয়ে ১২ ঘণ্টার সমান বিল দেয় ভোক্তা।

সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকা এবং আশপাশের এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট চলছে। ২-৩ বছরের মধ্যে এ সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ওই সময়ে অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে কোনো গ্যাসই মিলবে না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ থেকেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ভিআইপি এলাকা হিসাবে পরিচিত গুলশান এলাকার বাসাবাড়িতে বর্তমানে গ্যাস কিছুটা পাওয়া গেলেও রাজধানীর বাকি এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। সংসদ-সদস্যদের আবাসিক ভবন ন্যাম ভবনগুলোয়ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। সংকটের কথা জানিয়ে সংসদ সচিবালয় থেকে তিতাস গ্যাসকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিতাস এলাকায় আবাসিক গ্রাহক ২৮ লাখের বেশি।

তিতাস সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকার বাসাবাড়ি, রিফুয়েলিং স্টেশন এবং বাণিজ্যিক ও কয়েকটি শিল্প গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন দরকার ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ পাওয়া যাচ্ছে ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। ঢাকার আমিনবাজার দিয়ে আগে দৈনিক ৬ কোটি, টঙ্গী দিয়ে দেড় কোটি, ডেমরা দিয়ে ৮ কোটি এবং কদমতলী জোন দিয়ে আড়াই কোটি ঘনফুট গ্যাস ঢুকত ঢাকায়। সেখানে এখন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গ্যাস কম আসছে।

শুধু রাজধানীর বাসাবাড়ি বা রিফুয়েলিং স্টেশন নয়, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প এলাকার অবস্থাও বেশ খারাপ। গ্যাস সংকটের কারণে অনেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আংশিক চালাচ্ছেন। বিশেষ করে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার ও আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জ এলাকার অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। এসব এলাকায় গ্যাস সংকটে চলছে বলে জানিয়েছে তিতাস। এ সংকটের অন্যতম কারণ-কয়েক বছর ধরে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়া।

পেট্রোবাংলা এবং তিতাস সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি এ পরিস্থিতির আরও খারাপ হয়েছে। গত বছর দেশের ক্ষেত্রগুলোয় দৈনিক গড়ে গ্যাস পাওয়া গেছে ১৮০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। সেখানে গত চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট।

২০২৩ সালে দেশে দৈনিক (আমদানি করা এলএনজিসহ) গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয় ২৭৭ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট, ২০২৪ সালে ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৫ সালে ২৭০ কোটি ৬০ লাখ এবং ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ২৫৬ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। অন্যদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে। ২০২৩ সালে তিতাসকে সরবরাহ দেওয়া হয় ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, ২০২৪ সালে ১৪৮ কোটি ৩০ লাখ, ২০২৫ সালে ১৫২ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৬ সালে (জুন পর্যন্ত) ১৪৪ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট।

তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ দিনদিন কমবে। এ কারণে অযথা খরচ করতে চায় না সরকার। এ কারণে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৭ লাখ ৫০ হাজার গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার বসানোর প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার। এর বাইরে পাইপে লিকেজ, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং পুরোনো স্থানে নতুন ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসাতে হাতে নেওয়া হয়েছিল ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্প। সেটি চূড়ান্ত অনুমোদন হয়ে কাজ শুরুর আগ মুহূর্তে বন্ধ করে দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকার পুরোনো পাইপলাইন তুলে নতুন লাইন বসানোর কথা ছিল। সূত্র জানায়, ২০২১ সালে গ্যাস সংযোগ বন্ধের সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত ৫৬ হাজার গ্রাহক নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ডিমান্ড নোটের টাকা জমা প্রদান করেন। যেহেতু নতুন সংযোগ আর দেওয়া হবে না, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ডিমান্ড নোট ইস্যু করা গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। সেসময় তিতাস গ্যাস টাকা ফেরত দিতে একটি কমিটি গঠন করেছিল। তবে গত বছর পর্যন্তও তারা গ্রাহকের জমা করা টাকা ফেরত দিতে পারেনি।