বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি জুলাই সনদ মানবে বললেও গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয় না। কারণ গণভোটের রায় মেনে নিলেই জুলাই সনদে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটের রায় মেনে নিচ্ছে না। কারণ জুলাই সনদে ঐকমত্য কমিশন যেই ৮৪টি প্রস্তাব করেছে তারমধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের মূখ্য প্রস্তাব গুলোতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল।

আইনজীবী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে আজ বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: উত্তরণে আইনজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদ মানলে বিএনপির সেই নোট অব ডিসেন্টের আলোকে জুলাই সনদ কার্যকর হবে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান-প্রধান সমস্যা গুলো সংস্কার হবে না। কিন্তু গণভোট মানলে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। কারণ গণভোটের ব্যালেটে নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। এজন্যই বিএনপি গণভোটের রায় মেনে নিচ্ছে না। এবং বিএনপি গণভোটকে অবৈধ দাবি করছে।

তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার না মানলে সরকার ও সংসদ অবৈধ। ২০২৫ সালে ১৩ নভেম্বর যেই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার জারি হয়েছিল সেই অর্ডারের ভিত্তিতেই সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বিএনপি জনগণকে বোকা বানিয়ে ধোকা দিতে চেষ্টা করছে।

তিনি বিএনপিকে সতর্ক করে বলেন, জনগণ এখন আর বোকা নয়। সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশোধন অর্থ হচ্ছে একটা শব্দে বা বাক্য পরিবর্তন করা কিন্তু সংবিধান সংস্কারের অর্থ হচ্ছে পুরো কাঠামোর পরিবর্তন করা। জনগণ পুরো রাষ্ট্র কাঠোমোর পরিবর্তন চায়। তাই জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। এবং জনগণের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট জসীম উদ্দীন সরকার বলেন, বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেও অন্যায়ভাবে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তিনি হয়তো সেটি ভুলে গেছেন। তার মতোই পুরো জাতি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তৈরি সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে আবারও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কারণে। যারা এখন জুলাই সনদ নিয়ে তালবাহানা করছে তাদের কাউকে আন্দোলনকালীন সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা অতীত ভুলে যায়। যেই সিঁড়ি দিয়ে তারা ক্ষমতায় আসে সেই সিঁড়ি তারা নষ্ট করে দেয়।

ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম এমপি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করে সরকার জনগণের সাথে আরেকটি প্রতারণা করতে যাচ্ছে। সংবিধান সংশোধন নয় সংবিধান সংস্কার করতে হবে। সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করলে রাজপথে ফায়সালা হবে।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভানেত্রী ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১ নম্বর দফা হচ্ছে সংবিধান সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বিএনপি সংসদে এক তৃতীয়াংশ আসনের জোরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, এই আদেশ রাষ্ট্রপতি দিতে পারেন কিনা?- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রানজিশনাল পিরিয়ড নামে আমাদের সংবিধানে দুটি অনুচ্ছেদ আছে। একটি হচ্ছে ১৫০ অনুচ্ছেদ আরেকটি চতুর্থ তফসিল। এগুলো হচ্ছে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে বলে দেওয়া হয়েছে এই অর্ডারগুলো প্রেসিডেন্ট দিতে পারবেন। এজন্যই এই অর্ডার গুলো নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রান্তিকাল। এটা একটা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড। এই ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে ১৯৭২ সালে যদি আদেশ দেওয়া যায়, ১৯৭৩ সালে যদি আদেশ দেওয়া যায় তাহলে কেন ২০২৫ সালে ট্রানজিশনাল পিরিয়ড আদেশ দেওয়া যাবে না? - তার কারণ যদি সরকার দল দেখাতে পারে তাহলে আমরা আমাদের আর্গুমেন্ট প্রত্যাহার করে নেবো।

সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট মো. ইউসুফ আলীর সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সম্পাদক এডভোকেট মো. সাইফুর রহমান।

সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সম্পাদক এডভোকেট একেএম রেজাউল করিম খন্দকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন মিঠু, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি এডভোকেট ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া, বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সদস্য আজিমুদ্দিন পাটোয়ারী, জজকোর্ট বিভাগের সভাপতি এডভোকেট লুৎফর রহমান আজাদ, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট তারিকুল ইসলাম, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট রেজাউল ইসলাম রেজা প্রমুখ।