আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমের ধীরগতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচার কার্যক্রমের গতি কমে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া চিফ প্রসিকিউটর যেভাবে সাহসিকতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে অগ্রগতি এনেছিলেন, তা এখন থেমে গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ অভিযোগ করেন বক্তারা।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

সভাপতির বক্তব্যে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণহত্যার বিচার না হলে জনতার আদালতে এই সরকারের বিচার হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমাদের শহীদ ও আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারীরা জাতিকে এক নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জাতি প্রত্যাশা করেছে বিপ্লব পরবর্তী প্রথম কাজ হবে গণহত্যার বিচার, তারপর রাষ্ট্র সংস্কার, এরপর নির্বাচন। কিন্তু গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার ব্যতীতই একটি নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসে চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়ে দলীয় চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দিয়েছে। দলীয় চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগের পর থেকে গণহত্যার বিচারে ধীর গতি দেখা যাচ্ছে। ফলে আবারও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। গণহত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বিএনপি নির্বাচনের জন্য যতটা উদগ্রীব ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও গণহত্যার বিচারের বিষয়ে বর্তমানে তাদের কোনো উদগ্রীবতা দেখা যায় না। তিনি বলেন, সরকার যদি নিজেদেরকে জুলাইয়ের শক্তির পক্ষের শক্তি মনে করে তবে অবশ্যই আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে গণহত্যার দায়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। আওয়ামী লীগের বিচার না করলে আওয়ামী লীগ যেদিন ফিরে আসবে সেদিন থেকেই বিএনপিকে নির্বাসনে চলে যেতে হবে, সতর্ক করেন তিনি।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, জুলাই আন্দোলনকালীন আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সকল সংগঠনের সভাপতি-সেক্রেটারিকেও গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার দায়ে বিচারের আওতায় আনতে হবে। গণহত্যার বিচার নিয়ে গড়িমসি কাম্য নয়, মেনে নেয়া হবে না। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

জুলাই শহীদ মেহেদী হাসান জুনায়েদের পিতা শেখ জামাল হোসেন বলেন, আমার একমাত্র সন্তান জুনায়েদ। ট্রাইব্যুনাল শহীদ জুনায়েদ হত্যা মামলায় যেই রায় দিয়েছে। রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্য সুজন চানখারপুলে ৬ জনকে গুলী করে হত্যা করেছে এবং অনেককেই আহত করেছে, কিন্তু আদালত পুলিশ সদস্য সুজনকে মাত্র ৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে! যাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তারা কেউ দেশে নেই। এই বিচার প্রহসনের বিচার ব্যতীত কিছুই নয়। প্রহসনের বিচার না করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। শহীদ মেহেদী হাসানের মা, রাষ্ট্রের কাছে জানতে চান তার সন্তানকে হত্যা করার ২ বছর ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কেন তার সন্তান হত্যার বিচার হয়নি।

শহীদ আলিফের পিতা গাজিউর রহমান বলেন, জুলাই শহীদেরা কোনো মন্ত্রিত্ব চায়নি, পদ-পদবী চায়নি। তারা কেবলমাত্র দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে রাষ্ট্র সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য রাজপথে নেমে এসেছে। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী দুই বছরেও সরকার কোনো একটি মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেনি। তার সন্তান শহীদ আলিফ হত্যা মামলায় একজন আসামিও আজ পর্যন্ত আটক না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, আসামি আটক না করলে বিচার কার হবে, কীভাবে হবে? বিচারের নামে টালবাহানা চলছে।

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশির ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন। এছাড়াও জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই আন্দোলনে আহত-পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাইযোদ্ধা এবং ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন শেষে, জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করার ৭ দফা দাবিতে চিফ প্রসিকিউটর ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্টারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

স্মারকলিপির দাবিগুলোর হচ্ছে - জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত প্রধান প্রধান ঘটনাস্থলের (ক্রাইম সিন) পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

জুলাই ২০২৪-এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জড়িত অভিযুক্ত যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এখনও গ্রেফতার হননি এবং এখনো সরকারি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, রংপুর ও কুষ্টিয়া জেলার বাইরে সংঘটিত বহু ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযুক্তকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। অতএব, দেশের সকল জেলায় সংঘটিত অভিযোগসমূহের নিরপেক্ষ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী/অঙ্গসংগঠনের অনেক চিহ্নিত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। এর ফলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের স্বার্থে তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;

‘গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থন, উসকানি, ন্যায্যতা প্রদান অথবা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কিংবা এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির অভিযোগে যাদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রতীয়মান হবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

গুম, গুম-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড এবং নিহত ব্যক্তিদের লাশ গোপন বা ধ্বংস করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট টিএফআই ও জিআইসি-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করা;

গুম-সংক্রান্ত মামলাসমূহের তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক ধীরগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় বিচারপ্রার্থী, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অতএব, গুম সংক্রান্ত সকল মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।