নূরুন্নাহার নীরু

আমাদের পরিবারের জন্য ভয়ানক ২২শে মে রাত। এই দিনটি ছিল পরিবারের সাথে মহসিনের শেষ যোগাযোগ। আগের দিনই একমাত্র বড় বোন ও বড় মামা বেড়িয়ে এসেছেন স্নেহের মুহসিনের কাছ থেকে।

সময়টা ছিল ১৯৯৮ সালের মে মাস। মুহসিন ছিল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেকেন্ড প্রফ দিয়ে ভাইভার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মেডিকেলের পড়া যেহেতু অনেক কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ সেহেতু সে ছুটি পেয়েও বাড়ি যেতে পারেনি, হলেই অবস্থান করছিল পড়াশোনার জন্য। যার নাম জিয়া হল।

বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানাতে হলেও জন্ম থেকে ওরা ঢাকার গ্রিন রোডে বসবাসরত। চার ভাইবোনের মধ্যে মুহসিন সবার ছোট। এই ছোট্টটি শুধু ওদের পরিবারেই নয়, মামা, খালা, নানা-নানুর চোখের মনিও বটে। এমনকি চাচা ফুফুদের মধ্যেও ছিল সে তাদের মধ্যমণি। যেমনি ব্রিলিয়ান্ট তেমনি কাজে কর্মে তুখোড় আমাদের এই ভাগ্নেটি ছিল পরিবারের সবার প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পন্ন। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে থাকতো, ওকে আমরা রাগ করতে দেখিনি কখনো, অন্যের উপকারের জন্য সর্বক্ষণ কাজ খুঁজে বেড়াতো যেনো।

বড় আপা দুলাভাইয়ের একমাত্র মেয়ে ডা: ‘হাসিনা মাহমুদা ফেরদৌসী মমতা। ‘ এত বড় নামের পেছনের কাহিনী হল দুলাভাইর রাখা তাঁর ‘প্রিয়নেত্রী (!) শেখ হাসিনার’ নাম থেকে হাসিনা, আপার পছন্দের মাহমুদা, আম্মার ইচ্ছায় ফেরদৌসী আর আমরা খালাদের শখের মমতা। পরিবারের একমাত্র ও প্রথম কন্যাশিশু বিধায় সবার মন রক্ষার্থে এত বড় নামটি ই আজো ওকে বহন করতে হচ্ছে। সেই বোনটি মুহসিনের সবচেয়ে প্রিয় ও কাছের বন্ধু, সার্বক্ষণিক খেলার সাথী। কি ব্যাডমিন্টন আর কি দাবার গুটি- সব ক্ষেত্রে চাই আপুনি আপুনি।

মমতা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল প্রফ দিয়ে ঢাকায় এসেছে ছুটি কাটাতে। বড়পা’র চার সন্তানই চিকিৎসক। দুলাভাই নিজে ইঞ্জিনিয়ার হলেও তিনি সবসময় বলতেন, ডাক্তাররা চাইলেই হালাল রুজি করতে পারে, হালাল রুজিতে ডাক্তাররা কখনো ভাতে মরবে না। ইঞ্জিনিয়ারদের হালাল রুজি করা কঠিন।”

কিন্তু মমতার ছুটি কি আর ঘরে বসে কাটানো যায়? ভাইকে একলা সিলেটে রেখে? তাই ওদের বড় মামা আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই মহিমকে নিয়ে ও চলে যায় সিলেটে। সেখানে আমার খালাতো বোন ও জামাই সুরভী ও মিল্টনও অফিসিয়াল ট্যুরে ছিল। ওরা সবাই মিলে খুব মধুর সময় কাটায় মুহসিনকে নিয়ে। অনেক ঘুরাঘুরি করে ওরা বিদায় নেয় মুহসিনের কাছ থেকে। সেই যে আদরের বন্ধুপ্রতীম ছোট ভাইটিকে একাকী রেখে ফিরে আসে, সে শেষ স্মৃতি মমতাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়, বেদনা বিধুর করে তোলে চার সন্তানের জননী হাওয়া সত্ত্বেও।

ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় ফিরে ওরা। আগেরদিন মাত্র সে সময় মুহসিন মমতাকে বলেছিল, “জানো আপু আমাদের ক্যাম্পাসটা খুবই সুন্দর, রাজনীতি মুক্ত। আমার খুবই ভালো লাগে এই পরিবেশটা। এখানে মসজিদের ইমাম থেকে হলের দারোয়ান পর্যন্ত সবাই আমাদেরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। ইমাম সাহেব কে বলেছি, বড় ভাইয়ার(ডাক্তার হাসান, সলিমুল্লাহ মেডিকেল থেকে এমবিবিএস ) জন্য পাত্রী দেখতে।” মেয়েরা লন্ডন থেকে এসেছে, চক্ষু বিশেষজ্ঞ বাবা মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন।ফলে কথামতো ওরাও পাত্রী দেখে আসে সেই ইমাম সাহেবের সহযোগিতায়। পাত্রী পছন্দও হয়ে যায়। এখন দুই পরিবারের কথা চলবে মুরুব্বিদের মাধ্যমে। এমন-ই একটা সময়। কিন্তু কে জানত! একদিন পরই পরিবারকে দাঁড়াতে হবে কঠিন বাস্তবতার সামনে! দেখতে হবে হৃদয়বিদারক চিত্র!

মমতা, মহীম মুহসিন এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় রাতের গাড়িতে। মিল্টন চলে যায় অডিট এর কাজে। ফলে সুরভী একলা আর হোটেলে না থেকে সে রাতটা মুহসিন এর ছাত্রবন্ধু রুমমেটদের সাথে হোস্টেলে থেকে যায়। ইতোমধ্যে সন্ধ্যার দিকে ছাত্রলীগের তথাকথিত সোনার ছেলেদের সাথে ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো নিয়ে কিছুটা বাকবিতন্ডা হয়ে যায় জিয়া হলের শিবিরের ছাত্রদের মধ্যে। ছাত্রদের মধ্যে মুহসিনও ছিল একজন। সততা, ন্যায়পরায়নতা ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের উৎকর্ষতা দেখে আমার মুক্তিযোদ্ধা দুলাভাই কখনো ওদেরে বিরত রাখেননি শিবির করা থেকে। এমন কি চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রনেতা আমার ভাই মহিমও কখনো ওদেরে বাঁধা দিতে সাহস পায়নি বা অপছন্দও করেনি ওদের ব্যবহারিক জীবনে অভিভূত হয়ে।

যেহেতু সামনেই পরীক্ষা উপরন্তু হলটি একেবারেই হযরত শাহজালালের মাজার সংলগ্ন সেহেতু আপাতত: ডিশঅ্যান্টেনা না লাগানোর পক্ষে ছিল মুহসিনরা। সাধারণ ছাত্ররাও ওদের পক্ষে যোগ দেয়, ফলে যুক্তির কাছে হেরে গিয়ে তখনকার মত পালিয়ে যায় ছাত্রলীগের ছেলেরা। কিন্তু গভীর রাতে হল প্রশাসনের সহায়তায় এবং (রাষ্ট্রের প্রশ্রয় তো ছিলই) সেই ক্ষমতাটাকেই তারা অপব্যবহার করেছে হল রেড দেয়ার নাম করে। পুলিশের সাথে দলীয় নেতারাও প্রবেশ করে রুমে রুমে অনুসন্ধান চালায় বহিরাগত ও অস্ত্র উদ্ধারের নামে অহেতুক হয়রানি করে। তখনই তারা চিহ্নিত করে মুহসিন কোন রুমে থাকে! পুলিশরা চলে যেতেই দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই কতিপয় দূবৃত্ত ছাত্রনামধারী কসাইরা এসে আমাদের প্রিয় সেই ভাগ্নে মুহসিনকে ব্রাশ ফায়ার করে শেষ করে দিয়ে যায়,আহত করে অন্যরুমমেটদেরও।

সময়টা ছিল ভোররাত। পড়াশোনা শেষ করে অভ্যাসমতো অজু করে এসে তাহাজ্জুদের জন্য জায়নামাজ বিছিয়ে ছিল মাত্র। কিন্তু পড়া আর হয়ে ওঠেনি সেই নামাজ। এই খোদাভীরুতা,সত্যবাদিতা আর সুশৃংখল জীবন যাপনই ছিল ওদের কাল। নাম জোটে রাজাকার।

পরদিন সকাল হতেই ছাত্রলীগের কসাইগুলোর দ্বারা লাশ গুম করারও চলছিল বিশেষ প্রক্রিয়া। কিন্তু খোদার মেহেরবানীতে আল্লাহর সাহায্যেই উপস্থিত থাকা আমার খালাতো বোন সুরভী ও খবর পেয়ে ছুটে আসা মিল্টনের হস্তক্ষেপে রেহাই পায় লাশটি।

এক্ষেত্রে শিবিরের ভাইদের অবদান ছিল অপূরণীয় এবং সে সাথে তৎকালীন সিলেট জেলা আমীর ডাক্তার শফিকুর রহমান (বর্তমানে আমীরে জামায়াত বাংলাদেশ) করেছিলেন আন্তরিক ও সর্বাত্মক সহযোগিতা। তাঁদের প্রচেষ্টাতেই মুহসিনের লাশ স্বসম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসতে পারা গিয়েছিল।

সেই ঘটনাতে বড় আপা দুলাভাইয়ের বারে বারে মূর্ছা যাওয়া, নানা নানুর কলিজা ছেঁড়া কান্না, একমাত্র বোন মমতার নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া, বড় দুই ভাই সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন এর ছাত্র হাসান, হোসেন সবরের মূর্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল নির্বাক হয়ে। সেই দৃশ্য উপস্থিত কাউকেই না কাঁদিয়ে ছাড়েনি। আমরা অবাক হয়েছি সেদিন গ্রীনরোডের ক্রিসেন্ট রোডটি জনারণ্যে পরিণত হতে দেখে। মানুষ মুহসিনকে এত ভালোবাসতো! জামাত-শিবিরের ভাইবোনরা কোথা থেকে যে কিভাবে ছুটে এসেছিল তা অকল্পনীয়। কেউ বলছেন, মুহসিন আমাদের এ উপকার করেছে, কেউ বলছেন, ঐ উপকার করেছে। ভাবতেও কষ্ট হয় সে দিনের সেই কলিজার টুকরো ছেলেটি নটরডেমের ফার্স্টবয় মুহসিন শুধু আমাদের পরিবারের নয়, গোটা জাতির রত্ন হয়ে দাঁড়াত আজ।

জামায়াত-শিবিরের সেদিনের সেই ভূমিকা আমাদের পরিবারের জন্য একটা স্মরণীয় ও শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরবর্তীতে বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সাহেবের সহযোগীতাতেই ডা: হাসানের জন্য আমরা মুহসিনের পছন্দ করা মেয়ে সিলেটের মেয়ে লন্ডন প্রবাসী সুমনাকে বৌ করে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা তাঁর বাড়িতেই হয়েছিল। যাঁদের দুনিয়াবী প্রাপ্তির লোভ নেই তাঁরা এভাবেই পরোপকার করে থাকেন। জালিমদের হাত থেকে মুহসিনের লাশ হেফাজাতে সে সময়ে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য আমরা আজো তাঁর ও দলের কাছে কৃতজ্ঞ।

মুহসিন আমাদেরকে শিখিয়ে গিয়েছিল, “সত্যের পথে অবিচল থাকো তবু হার মেনো না অসত্যের কাছে, অন্যায়ের কাছে।” পরবর্তীতে ‘প্রিয়হাসিনা’ বিমুখ হওয়া দুলাভাইয়ের জীবনের বাঁক ঘুরে গেছিল এ মন্ত্রণা থেকেই। পরিবর্তন ঘটেছিল আমাদের গোটা পরিবারের। তবে আফসোস আর হাহাকার থেকে গেল যে! আমরা বিচার চাইতে পারিনি। এমন কি ১৬-১৭টা বছর কণ্ঠ রোধ করে নির্বাক হয়ে থাকতে হয়েছে আমাদেরে। আমাদের পরিবারটা মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। বড় দুলাভাই নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আর আমার বড় ভাই, মামা ছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। চাঁদপুর মহকুমা শহরের নামকরা ফুটবল খেলোয়াড়, হাসানআলী হাই স্কুলের ছাত্র বোরহানউদ্দিন খান এর নাম আজও আছে সবার হৃদয়ে যারা সে সময়ের।

আজ ভাইজান বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতাম,

“তোমরা কি ইসলামকে ঠেকানোর জন্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে ভাইয়া?”

“তোমরা কি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ খেকো হবার জন্যেই অস্ত্র হাতে নিয়েছিলে ভাই?”

“মুহসিনের মত নিস্পাপ নিরপরাধ শিশুদের হত্যা করার জন্যই কি চেতনার সদাইকারী হয়েছিলে?”

আমার ভাই, মামা, দুলাভাই বেঁচে নাই, যাঁরা বেঁচে আছেন এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের কাছে থেকে গেল আমার এই প্রশ্নগুলো।

আল্লাহ যেন আমাদের মুহসিনকে সত্যিকার অর্থেই শহীদের মর্যাদা দিয়ে কবুল করেন। কবুল করেন ভাইজান, মামা এবং দুলাভাইকেও। যারা সত্যিকার অর্থেই ১৯৭১ সালে ৯ মাস ধরে দেশের জন্যেই ফ্যাসীবাদবিরোধী লড়াই করেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়! তাদের রক্ত চিরকালই ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধেই সোচ্চার থাকবে।