এ্যাডভোকেট আবু হাসিন
পাট শিল্প হলো বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্প, যা ব্রিটিশ শাসনামলে এবং পাকিস্তানী আমলে একক বৃহত্তম শিল্প। বর্তমান বিশ্বের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বৈদেশিক রপ্তানি আয়ের বৃহদাংশই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মোট বিশ্ববাজারের প্রায় ৬৫%। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এ অঞ্চলে পাটের চাষ হলেও এখানে প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালের মাঝামাঝিতে নারায়ণগঞ্জে; বেসরকারি পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত এ মিলটির নাম ছিলো বাওয়া পাটকল। পরবর্তীতে এ সময়েই একই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী পাটকলের; এবং এর পরপরই কয়েক বছরের মধ্যে গড়ে ওঠে অসংখ্য পাটশিল্প কারখানা, ১৯৬০’এ যার সংখ্যা ১৬টি ও ১৯৭১ সালে যা দাড়াঁয় ৭৫টিতে।
এক সময় পাটই ছিলো আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কালের বিবর্তনে সে সোনালী অতীত কালের গর্ভে হারিয়ে গেলও এর উপযোগিতা ও গুরুত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মূলত, পাট একটি বর্ষাকালীন ফসল। অর্থকরী ফসল হিসেবে পাট খ্যাত। এর জীবনকাল ১০০ থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত। বাংলাদেশে পাটকে সোনালী আঁশ বলা হয়ে থাকে এবং পাটই বাংলার (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের) শত শত বর্ষের ঐতিহ্য।
আমাদের দেশে দু’ধরনের পাট দেখতে পাওয়া যায়। Corchorus capsularis (সাদা পাট বা তিতা পাট) ও Corchorus olitorius (তোষা পাট বা মিঠা পাট)। এটি Tiliaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। মনে করা হয় সংস্কৃত শব্দ পট্ট থেকে পাট শব্দের উদ্ভব হয়েছে। চট্টগ্রামে পাটকে ‘নারিস’ শাক নামেও অভিহিত করা হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের ১ মার্চ প্রজ্ঞাপনের গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। ৬ মার্চ পালিত হয় জাতীয় পাট দিবস। বাংলাদেশে বর্তমানে পৃথিবীর মাত্র ২৪ শতাংশ পাট জন্মে। এত উৎকৃষ্ট পাট পৃথিবীর অন্য কোথাও উৎপন্ন হয় না। বর্তমানে পাট উৎপাদনে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল প্রথম, ফরিদপুর অঞ্চল দ্বিতীয়, যশোর অঞ্চল তৃতীয় এবং কুষ্টিয়া অঞ্চল চতুর্থ। মূলত, বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পাট, যা এর সোনালী আঁশের রঙ এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অবদানের জন্য ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত। ঊনিশ ও বিশ শতকে পাট ছিল বাঙালি মধ্যবিত্তের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
সিন্ধু সভ্যতা থেকেই বস্ত্র ও রশিতে পাটের ব্যবহার হয়ে আসছে। পরবর্তীতে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে পাট সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) পাটই ছিল সমগ্র পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস। পাটের আয় দিয়েই বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছে। এক সময় বিশ্বে মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পাট উৎপন্ন হতো অবিভক্ত বাংলায়। যুক্তরাজ্য (ডান্ডি) ও কলকাতার (হুগলি নদীর তীরে) পাটকলগুলো ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। পতন ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ১৯৭০-৮০ এর দশকে যখন সিন্থেটিক বা প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার শুরু হয়, তখন পাটের ঐতিহ্যবাহী বাজার প্রায় হারিয়ে যায়। তবে বর্তমানে পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিশ্বব্যাপী পাটের বহুমুখী পণ্যের চাহিদা আবার বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাট থেকে পলিব্যাগের বিকল্প হিসেবে পচনশীল ‘সোনালী ব্যাগ’ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় দেশেই উন্নতমানের বীজ উদ্ভাবন ও পাট শিল্পের হারানো গৌরব ফেরাতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ফলে পাটের অতীত গৌরব ফিরে আসার সমূহ স¤া¢বনা দেখা দিয়েছে।
আমাদের দেশে পাট ও পাট শিল্পের গৌরব আগের মত না থাকলেও রপ্তানি বাণিজ্যে পাট ও পাটপণ্যের গুরুত্ব কমেনি বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত এক তথ্য বিবরণীতে জানা গেছে, টানা চার বছর পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি কমার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। যদিও করোনাকালের রেকর্ড রপ্তানি থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে খাতটি।
এক দশক পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের কাছাকাছি থাকলেও করোনাকালে অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে একলাফে তা ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, যা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তারপর টানা চার বছর খাতটির রপ্তানি কমেছে। তবে সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি পৌনে ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলার। এই রপ্তানি গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বন্যার কারণে গত বছর পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যায়। উচ্চ মূল্যের কারণেই অর্থের হিসাবে পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। তবে পরিমাণের দিক থেকে রপ্তানি বাড়েনি। যদিও পরিমাণের দিক থেকেও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সে জন্য কাঁচা পাটের সরবরাহব্যবস্থা মসৃণ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষণা ও পণ্যের মান উন্নয়নের পাশাপাশি যৌথভাবে হলেও এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। বছরে দেশে ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। পাটপণ্যের রপ্তানি ৫শ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যদিও রপ্তানি বাড়াতে করণীয় বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ সরকারের দিক থেকে দেখা যায়নি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি পাটের সুতা, বস্তা ও বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্য তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। বিদায়ী অর্থবছর কাঁচা পাটের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে কাঁচা পাটের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে ৩৮ হাজার টন কাঁচা পাট রপ্তানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন।
বিদায়ী অর্থবছরে পাটের বস্তার রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে; আর পাটের সুতার রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলার হয়েছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে পাটের সুতার রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়। তার আগের অর্থবছর রপ্তানি হয়েছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন। যা এ শিল্পে নতুন করে আশাবাদের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছর প্রতি মণ কাঁচা পাট ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। তার আগের বছরও এর দাম তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ছিল। মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১ হাজার ডলারের পণ্যের দাম বেড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলার হয়েছে। সে কারণে অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে। তারা আরও বলেন, পাটপণ্যের রপ্তানি অনায়াসে দুই-তিন বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তার জন্য কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা মসৃণ করতে হবে। সে সঙ্গে নতুন বাজারে রপ্তানির জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে পাটজাত পণ্য, বিশেষ করে বহুমুখী পাটপণ্যের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকলেও সেই রপ্তানি কম বাংলাদেশের। বিদায়ী অর্থবছর ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। উদ্যোক্তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বহুমুখী পাটপণ্যের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রয়াদেশ কমেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। মূলত জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে নিত্যপণ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। তা ছাড়া কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে। সে জন্যও ক্রয়াদেশ কিছুটা কমেছে।
জানা যায়, বৈশ্বিক বাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্যের চাহিদার পাশাপাশি পাটের তৈরি শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, গার্ডেনিং বা বাগান, অটোমোবাইল ও প্যাকেজিংয়ে পাটপণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এ ছাড়া পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও রয়েছে চীনসহ বিভিন্ন দেশে।
মূলত, পাটের সুতা ও বস্তায় প্রতি টনে খুবই কম মুনাফা করেন আমাদের ব্যবসায়ীরা। ফলে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে গেলে মুনাফা ধরে রাখতে হিমশিম খান তাঁরা। পাট খাতের রপ্তানি বাড়াতে হলে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে চীন, ভারতের মতো কয়েকটি দেশ এগিয়ে গেছে। তাই বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হলে নতুন নতুন পণ্য উন্নয়নে গবেষণার পাশাপাশি এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আসতে হবে। তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তারা নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারবেন।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য আবার ফিরে আসার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। নিকট অতীতে প্রাস্টিক জাতীয় দ্রব্য ও পলিথিন পাটের বিকল্প হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেও এসব পরিবেশ বান্ধব না হওয়ায় পাট ও পাটজাত পণ্য আবারো নতুন করে উপযোগিতা সৃষ্টি করেছে। তাই সরকার যদি এখাতকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয় এবং বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে পাটের সোনালী দিন আবারো ফিরে আসবে। পাট শিল্প আবার ফিরে আসবে পুরনো আঙ্গিকে। চাষীরাও হবেন উপকৃত। তাই সরকার সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই এ শিল্প থেকে আমরা অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবো।
লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।