সিদ্ধ, নিষিদ্ধ-এগুলো বাংলা ভাষার শব্দ। অন্য ভাষায়ও এই ভাব বহনকারী শব্দ আছে। অর্থাৎ সমাজে, রাষ্ট্রে সব কিছু চলতে পারে না; সামাজিক মূল্যবোধ ও আইন সেখানে শৃংখলা ও শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে থাকে। সমাজে শান্তি, শৃংখলা, স্থিতি, বিকাশÑএগুলো নাগরিকদের কাম্য বিষয়। তবে এখানে রকমফেরও আছে। শাসকরা, ক্ষমতাবানরা অনেক সময় শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার নামে দমননীতি গ্রহণ করেন, জুলুম-নির্যাতন চালান। এ পথে গিয়ে তারা আসলে দ্রোহ-বিদ্রোহকে আমন্ত্রণ জানান। এটা আসলে শান্তি-শৃংখলার ভালো উদাহরণ নয়। শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত স্বাভাবিক ও যৌক্তিক বিধান, যাতে কারো অধিকার ক্ষণ্ন না হয়। আমরা জানি, বিধানের সাথে জড়িত থাকে নিষিদ্ধের বিষয়টিও।
এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের সাথে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে গেছে ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি। অতীতের সীমালংঘনমূলক আচরণ এর কারণ। আমরা জানি, ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোয় ভুভুজেলা বাঁশি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, সম্প্রতি প্রকাশিত স্টেডিয়ামের আচরণবিধিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ‘ভুভুজেলা’ যেন এক বাড়াবাড়ির নাম। এ বাঁশি যারা বাজিয়েছেন, তারা শব্দ দূষণ ও অন্যের অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখেননি, আপন উত্তেজনা ও অতিআনন্দের বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেবারের ম্যাচগুলোতে কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল গ্যালারির দর্শকদের এই বাঁশি। লম্বা প্লাস্টিকের এই বাঁশি আলোড়ন তুলেছিল পুরো বিশ্বে। তবে তা মানুষের কাছে গ্রহণীয় বলে বিবেচিত হয়নি। সীমালংঘনের দোষে দুষ্ট এই বাঁশি শুধু খেলায় আনন্দ লাভের ক্ষেত্রেই বিঘ্ন ঘটায়নি, খেলা পরিচালনার পরিবেশকও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাইতো এবার ভুভুজেলা বাঁশির ওপর নেমে এলো নিষেধাজ্ঞা।
ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী কেবল ভুভুজেলা নয়, এয়ার হর্নসহ মাত্রাতিরিক্ত শব্দ তৈরি করে এমন যে কোনো ধরনের যন্ত্র ১৬টি ভেন্যুর কোনোটিতেই নেওয়া যাবে না। এছাড়া লেজার রশ্মি ছড়ায়Ñএমন যন্ত্র বা লেজার পয়েন্টার নেওয়াও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পোশাকের বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেÑশরীরে রং করা বা ট্যাটিু আঁকাকে কোনোভাবেই পোশাক হিসেবে গণ্য করা হবে না। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল নিয়ে দর্শকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ফিফা। এ বিধানগুলো যারা আমান্য করবেন, তাদের স্টেডিয়ামে ঢুকতে দেওয়া হবে না কিংবা স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে ফিফা বেশ সচেতন বলেই মনে হচ্ছে। আমরা ফিফার বিধি-বিধানগুলোকে স্বাগত জানাই। বিশ্বকাপে ফুটবল খেলাটাই আসল। এখন কোনো বিষয় যদি খেলার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায়, দর্শকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে কিংবা ঘটায় শব্দদূষণÑতাহলে এসবকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে কোন যুক্তিতে? খেলা হোক কিংবা অন্য বিষয়Ñসেখানে শৃংখলা ও নৈতিকতার দিকগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান সভ্যতা ও বিশ্বব্যবস্থায় এসব বিষয়ে ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ফিফার উদ্যোগকে আমরা একটি বার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।